গর্ভাবস্থায় কোন ধরনের সম্পুরক খাবার/সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যায়?

গর্ভাবস্থায় কোন ধরনের সম্পুরক খাবার/সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যায়?

 

আপনি যখন গর্ভবতী তখন পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার খাদ্যে যদি অপরিহার্য পুষ্টির অভাব হয় তবে আপনার শিশু ভালভাবে বাড়বে না। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক উৎস আছে কিন্তু তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

সম্পুরক খাবার স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প নয়, কিন্তু সাধারনত গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিমানে সব ধরনের পুষ্টি খাবার থেকে পাওয়া সম্ভব হয় না। হয়ত বা আমাদের মাটি পুষ্টির দিক থেকে যথেষ্ট নয় যেমনটি হওয়া উচিত, অথবা প্রয়োজনমত সবজি ও ভিটামিন খাওয়ার সময় আমাদের নেই। (Nils 2016)

ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান গর্ভাবস্থার প্রতিটি স্তরে আপনার স্বাস্থ্য এবং শিশুর   বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অপর্যাপ্ত সম্পূরক খাবার গ্রহন আপনার এবং আপনার শিশুর জন্য অনেক সমস্যা হতে পারে, এবং এটা আপনার গর্ভাবস্থায়ও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষতের সংক্রমণ, অকালমৃত্যু এবং মৃত সন্তান প্রসব এখনও ভারতীয় মায়েদের একটি সাধারণ সমস্যা এবং এর একটি বড় কারন হল সম্পূরক খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ না করা- এমনকি যেসব ক্ষেত্রে ভারত সরকার  কর্তৃক ভর্তুকি বা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

সম্পূরক খাবার গ্রহণ মহিলাদের সিরামে ভিটামিনের ঘনত্ব প্রভাবিত করে। ডাক্তারদের মতে আয়রন, ফোলেট, ভিটামিন ডি এবং অল্প পরিমাণে, ক্যালসিয়াম ও আয়োডিন, সাধারণ খাদ্যতালিকাগত অভাব যা গর্ভবতী নারীদের জন্য খুবই  গুরুত্বপূর্ণ ।(Nagel et al. 2010)

কি খেতে হবে?

ফোলেট

ফোলেট (প্রাকৃতিক উপাদান) একটি সাপ্লিমেন্ট যা স্নায়ুর সংক্রমণ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্ম পূর্ববর্তী ভিটামিনে প্রতিদিন ৬০০-৮০০ মি.গ্রা. ফোলেট থাকতে হবে। এটা সস্তা, সহজেই পাওয়া যায় এবং প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলা সহজে গ্রহণ করতে পারেন।

প্রোবায়োটিক

গর্ভধারণকালে আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই নিয়মিত  প্রবায়োটিক গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ যা নিশ্চিত করে যোনিপথে প্রসবের সময় আপনার শিশুটি তার জন্য পরিমিত উপকারী ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করেছে,  প্রোবায়োটিকসগুলি কানের সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করে এবং আপনার শিশুর প্রথম বছরে অসুস্থ হয়ে পড়া রোধ করে। এছাড়াও, প্রোবায়োটিকগুলি গর্ভাবস্থায় এবং গর্ভকালীন সময়ে মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করে।

প্রসবপূর্ব ভিটামিনসমূহ

প্রসবপূর্ব ভিটামিনগুলো হল মাল্টিভিটামিন যা গর্ভকালীন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসের বাড়তি চাহিদা পুরন করে। এগুলো আপনার সন্তানের প্রিক্ল্যাম্পাসিয়াজনিত মৃত্যু ঝুঁকি হ্রাস করে। আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন এবং অতিরিক্ত ভিটামিন এবং খনিজ সম্পূরকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আপনার নির্ধারিত ডোজ গ্রহণ করা উচিত।

ভিটামিন ডি

গর্ভাবস্থায় ভিটামিন ডি খুবই গুরুত্বপুর্ন। মায়েদের ভিটামিন ডি’র লেভেল চেক করা এবং যদি ঘাটতি থাকে তবে সঠিক মাত্রার ভিটামিন ডি গ্রহণ করা খুবই জরুরী। সুস্বাস্থ্যের জন্য আদর্শ সীমা হল ৫০-৮০ মি.গ্রা./মি.লি.

সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে পাওয়া যায় যে, ভিটামিন ডি গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতা যেমন গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস, প্রিক্ল্যাম্পাসিয়া এবং কম ওজন-সম্পন্ন নবজাতকের জন্মের মতো ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করে। শিশুর হাড় এবং হরমোনের বিকাশ মূলত ভিটামিন ডি এর উপর নির্ভর করে এবং এটি গর্ভাবস্থায় মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

ডাক্তারেরা পরামর্শ দেন যে শিশুরা মায়ের দুধ থেকে ভিটামিন ডি পেতে পারে যদি মা ৫০০০ আইইউ/দিন পায় (যা মুখে, পায়ে, হাতে, পিঠের উপর সরাসরি ৩০ মিনিট বা তার চেয়ে বেশিক্ষন দুপুরের রোদ লাগানোর সমান হয়)।

ভিটামিন বি

এটাকে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বি কমপ্লেক্সের পুরো আটটি ভিটামিন আপনার স্বাস্থ্যের উপর গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করে গর্ভে যখন আপনার সন্তান বাড়ছে। প্রথম এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময়, বেশিরভাগ মহিলারা বেশ ক্লান্ত বোধ করেন, ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবার আপনার বাড়তে থাকা বাচ্চার জন্য এইসব পুষ্টিকর ভিটামিনের সাথে আপনার স্বাভাবিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ভিটামিন বি১২ আপনার স্নায়ুতন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটাও ধারনা করা হয় যে গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের সাথে মিলিত হলে, বি১২ সাপ্লিমেন্টগুলি আপনার বাচ্চার মেরুদণ্ড ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের জন্মগত ত্রুটির সম্ভাবনাকে প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।

ভিটামিন সি

প্রতিদিন আপনার ও আপনার বাচ্চার ভিটামিন সি প্রয়োজন হয় কারণ এটি শরীরের জন্য কোলেজেন তৈরিতে প্রয়োজনীয়। কোলাজেন একটি গঠনমুলক প্রোটিন যা নরম হাড়, সন্ধিবন্ধনী, হাড়, এবং ত্বক তৈরি করে। ভিটামিন সি টিস্যু মেরামত, ক্ষত নিরাময়, হাড়ের বৃদ্ধি ও মেরামত এবং স্বাস্থ্যকর ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয়। ভিটামিন সি আপনার শরীরকে সংক্রমণ বিরুদ্ধে লড়তে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে কোষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।

ম্যাগনেসিয়াম

গুরুতর ম্যাগনেসিয়ামের অভাবের দরুন প্রিক্ল্যাম্পাসিয়া হতে পারে, অপর্যাপ্ত ভ্রূণের বৃদ্ধি বা এমনকি ভ্রূণের মৃত্যুরও হতে পারে। উপযুক্ত ম্যাগনেসিয়াম মাত্রা গর্ভাবস্থায় মাকে সেরে উঠতে এবং শিশুকে অধিক গর্ভের পুষ্টি পেতে সাহায্য করে। যেহেতু খাবার থেকে ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া কঠিন, সাপ্লিমেন্টের জন্য আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

ওমেগা

ওমেগা-৩, প্রধানত মাছের তেল, এটি শিশুর বিকাশে সহায়ক, বিশেষ করে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি। অকালমৃত্যু রোধে তারা একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। ওমেগা ৩ মা হিসাবেও আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আপনার রক্ত সঞ্চালন এবং পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেও ভূমিকা রাখে।

আয়োডিন

থাইরয়েড হরমোনের সংশ্লেষণের জন্য আয়োডিন দরকার হয়, যা পুরোটা জীবন জুড়ে কোষের বিপাক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয়। গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের মাঝে আয়োডিনের অভাব সবচেয়ে মারাত্মক। গর্ভাবস্থায়, আয়োডিনের অভাব ক্ষতিকরভাবে ভ্রূণের বিকাশকে প্রভাবিত করে। চরম আয়োডিনের অভাব গুরুতর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে- এই অবস্থা ক্রিটেনিজম নামে পরিচিত। শিশুদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে গর্ভাবস্থায় আয়োডিন সম্পূরকের প্রয়োগ জনস্বাস্থ্যের উপর গুরুত্ব প্রকাশ করে।

ক্যালসিয়াম

ভ্রূণের কঙ্কাল বিকাশের জন্য ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। ভ্রূণের হাড় এবং খনিজ বিকাশে ক্যালসিয়ামের প্রভাব ছাড়াও গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ৩০% হ্রাস করে।

ভিটামিন এবং খনিজ সাপ্লিমেন্টের মাত্রা

চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনসমূহ
ভিটামিন এ ৭৭০ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন ডি ৫ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন ই ১৫ মিলিগ্রাম
ভিটামিন কে ৯০ মাইক্রোগ্রাম
পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনসমূহ
ভিটামিন সি ৮৫ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি৬ ১.৯ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি ১২ ২.৬ মাইক্রোগ্রাম
ফোলেট ৬০০ মাইক্রোগ্রাম
খনিজ
ক্যালসিয়াম ১০০০ মিলিগ্রাম
আয়রন ২৭ মিলিগ্রাম
জিঙ্ক ১১ মিলিগ্রাম

এটি গর্ভবতী মহিলাদের উপর ভিত্তি করে তৈরি

  • বয়স ২৫-৪০ বছর
  • স্বাভাবিক ওজন সীমা বিএমআইঃ ১৬.৫-২৪.৯ (মোট ওজন প্রবৃদ্ধি ২৫-৩৫ পাউন্ড)

(Expert Rev of Obslet Gynecol, 2010)

দ্রষ্টব্য: লোহা এবং ক্যালসিয়াম একত্রে ভালভাবে শোষিত হতে পারেনা, এজন্য অধিকাংশ ডাক্তার বেশী (অথবা কোন) ক্যালসিয়াম যোগ করেন না। কিন্তু আপনি যদি সম্পুরক হিসাবে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে থাকেন তবে আয়রন থেকে ভিন্ন সময়ে গ্রহণ করুন, যাতে এটি একটি অপরটির শোষনে বাঁধা সৃষ্টি না করে।

কি কি এড়িয়ে চলতে হবে?

অতিরিক্ত পরিমানে ভিটামিন এড়িয়ে চলা উচিত। কলিজা, মাংস, মাছ ও ডিমে ভিটামিন পাওয়া যায়। শস্য দানায়ও ভিটামিন-এ রয়েছে, যার অর্থ হল খাদ্য থেকে সহজেই সর্বোচ্চ পরিমানে ভিটামিন-এ পাওয়া যায়। সম্পুরক খাদ্য গ্রহনের পুর্বে অনুগ্রহ করে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন কেননা এটা আপনার জন্য অপ্রয়োজনীয় হতে পারে।

ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের অতিরিক্ত গ্রহনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অনুগ্রহ করে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন কারন সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীরা ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করেন তারা ৭০% বেশী হৃদ ত্রুটিযুক্ত বাচ্চা প্রসব করেন।

ভিটামিনকে অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে জন্ম নেয়া শিশুর জন্ডিস বৃদ্ধি করে এবং অবস্থা আরও জটিল করে তোলে।

বাচ্চা নেয়ার সিদ্ধান্ত একটি জীবন পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত একজন যত্নশীল মা হিসাবে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি গ্রহন করা আপনার দায়িত্ব সুস্থ গর্ভধারণ নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগণ প্রসবপূর্ব সম্পূরক খাদ্য/সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে প্রস্তাব পরামর্শ দেন যেকোন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, হারবাল বা অন্য কোনও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পুর্বে সর্বদা আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন

References:

https://www.healthline.com/nutrition/supplements-during-pregnancy

https://www.webmd.com/baby/guide/prenatal-vitamins#1

https://americanpregnancy.org/pregnancy-health/nutrients-vitamins-pregnancy/

Nils Milman, Tomasz Paszkowski, Irene Cetin, and Camil Castelo-Branco. Supplementation during pregnancy: beliefs and science. Gynecol Endocrinol, 2016; 32(7): 509–516.

Hung TH, Lo LM, Chiu TH, Li MJ, Yeh YL, Chen SF, Hsieh TT. 2010. A longitudinal study of oxidative stress and antioxidant status in women with uncomplicated pregnancies throughout gestation. Reprod Sci 17:401–409

Nagel G, Weinmayr G, Kleiner A, Garcia-Marcos L, Strachan DP, ISAAC Phase Two Study Group. 2010. Effect of diet on asthma and allergic sensitization in the International Study on Allergies and Asthma in Childhood (ISAAC) Phase Two. Thorax 65: 516–52