গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া

গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া

 

শিশুর পুষ্টি সরবরাহে সাহায্য করার জন্য গর্ভবতী মহিলাদের শরীরের অতিরিক্ত পরিমাণ রক্ত উৎপন্ন হওয়ায় তারা রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। রক্তের পরিমান বৃদ্ধির কারণে গর্ভাবস্থায় হালকা অ্যানিমিয়া হওয়া স্বাভাবিক, তবে আরও গুরুতর অ্যানিমিয়া আপনার বাচ্চাকে শৈশবে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

অ্যানিমিয়া কি?

অ্যানিমিয়াকে রক্তাল্পতাও বলা হয়, এটি একটি স্বাস্থ্য অবস্থা যাতে শরীরের টিস্যুতে অক্সিজেন বহন করার জন্য যথেষ্ট সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা থাকেনা এবং রক্তে মোট লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের পরিমান হ্রাস পায়।

গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়ার প্রভাব কি?

গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়ায় বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হল এটি কম ওজনের বাচ্চার জন্ম, অকাল প্রসব এবং মাতৃ মৃত্যুর সাথে জড়িত। গর্ভাবস্থায় গুরুতর অ্যানিমিয়া নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব, জন্মের সময় বাচ্চার কম ওজন এবং প্রসবোত্তর বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু গবেষণায় দেখা যায় এটি জন্মের আগে বা পরে অনতিবিলম্বে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ায়।

গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়া কত প্রকারের?

গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন ধরনের অ্যানিমিয়ার বিকাশ ঘটতে পারে এবং গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া অ্যানিমিয়ার ধরনগুলো হলঃ

লৌহের অভাবজনিত অ্যানিমিয়া

এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যানিমিয়ার প্রধান কারণ, এবং

গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে সাধারণ ধরনের অ্যানিমিয়া হল এটি।  গর্ভবতী নারীদের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ এই অবস্থার শিকার হন।

লৌহের অভাবজনিত অ্যানিমিয়ায় রক্ত সমস্ত শরীরের টিস্যুতে যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন পরিবহন করতে পারে না। এমতাবস্থায় শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে এবং রোগ সংক্রমণের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে।

ফোলেটের অভাবজনিত অ্যানিমিয়া

গর্ভা

বস্থায় মহিলাদের উচ্চ মাত্রার ফোলেট দরকার হয় কারণ ফোলিক অ্যাসিড গর্ভাবস্থায় স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটিসমূহ প্রতিরোধ করতে পারে। ফোলেট হল এমন ভিটামিন যা প্রাকৃতিকভাবেই সবুজ শাক সবজির মত কিছু খাবারে পাওয়া যায় যেমন ভিটামিন বি।

একজন মহিলার গর্ভধারণের চেষ্টা করার আগে থেকেই ফোলিক এসিড নামক সম্পূরক খেতে পরামর্শ দেয়া হয় কারণ ফোলেটের অভাব সরাসরি কিছু ধরনের জন্মগত ত্রুটির জন্য দায়ী যেমন স্নায়ুতন্ত্রের অস্বাভাবিকতা (স্পিনা বিফিডা) এবং জন্মের সময় বাচ্চার কম ওজন।

ভিটামিন বি ১২ এর অভাব

শরীরে সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা গঠন করতে ভিটামিন বি ১২ লাগে। যদি একজন গর্ভবতী মহিলা খাদ্য থেকে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন বি ১২ না পান, তাহলে তার শরীর যথেষ্ট সুস্থ লাল রক্তকণিকা উত্পন্ন করতে পারে না।

ফোলেট এবং ভিটামিন বি ১২ এর অভাব প্রায়ই একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায় এবং যেসব নারীরা মাংস, হাঁস-মুরগী, দুগ্ধজাত দ্রব্য এবং ডিম খান না তাদের মধ্যে ভিটামিন বি ১২ ঘাটতির ঝুঁকি বেশি থাকে।

গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়া/রক্তাল্পতার ঝুঁকি কি কি?

সব গর্ভবতী মহিলাদেরই অ্যানিমিক হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং আপনার গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে, যদি আপনার/আপনিঃ

  • গর্ভে যমজ/একাধিক বাচ্চা থাকে
  • যথেষ্ট লৌহ সমৃদ্ধ খাবার না খান
  • গর্ভধারনের আগে ভারী মাত্রায় মাসিক/ঋতুস্রাব হয়
  • কম সময়ের ব্যবধানে দুই বা ততোধিক গর্ভধারণ করেন
  • প্রাতঃকালীন অসুস্থতার ফলে নিয়মিত বমি করতে থাকেন

গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়ার লক্ষণগুলি কি কি?

যদিও হালকা অ্যানিমিয়ার ক্ষেত্রে কখনও কখনও উপসর্গ নাও থাকতে পারে তবে মাঝারি থেকে গুরুতর অবস্থার কারণে নিম্নলিখিত উপসর্গ এবং লক্ষণগুলি উপস্থিত থাকতে পারেঃ

  • অবসাদ
  • দুর্বলতা
  • হলুদ বা হলুদাভ ত্বক
  • অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
  • নিঃশ্বাসের দুর্বলতা
  • মাথা ঘোরা বা ঝিম ঝিম করা
  • বুকে ব্যাথা
  • হাত ও পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া
  • মাথা ব্যাথা

এটি খেয়াল রাখা জরুরী যে কিছু উপসর্গ অ্যানিমিয়া ছাড়া অন্য কোন কারণেও দেখা দিতে পারে, তাই ডাক্তারের সাথে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ এবং ডাক্তার সাধারণত আপনার প্লাজমায় লোহিত রক্তকণিকার শতাংশে পরিমান এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ চেক করতে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করে থাকেন।

কিভাবে গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়া চিকিত্সা করা যায়?

গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়ার চিকিত্সা সহজেই আপনার দৈনিক রুটিনে লৌহ এবং/অথবা ভিটামিন সম্পূরক যোগ করে করা যায়। গর্ভাবস্থায় আপনি যদি অ্যানিমিয়া প্রবণ হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জন্মপূর্বকালীন ভিটামিনের সাথে সাথে লৌহ সম্পূরক এবং/অথবা ফোলিক অ্যাসিড সম্পূরক গ্রহণ শুরু করা লাগতে পারে। খুবই বিরল ক্ষেত্রে, তীব্র অ্যানিমিয়া আক্রান্ত মহিলাদের রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

কিভাবে গর্ভাবস্থায় অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ করা যায়?

আপনি গর্ভবতী হন বা হওয়ার চেষ্টা করছেন তাহলে ভাল পুষ্টিকর খাবার খাওয়া হল অ্যানিমিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে ভাল উপায়। বেশিরভাগ মহিলারা গর্ভাবস্থায় সঠিক খাবার খেয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে লৌহ ও ফোলিক অ্যাসিড পেতে পারেন।

লৌহ সমৃদ্ধ খাবারের উদাহরণঃ

  • চর্বিহীন, লাল মাংস এবং হাঁস-মুরগী
  • ডিম
  • গাঢ় বাদামী সবুজ পাতাযুক্ত সবজি (যেমন ব্রোকলি, পাতা কপি এবং পালং শাক)
  • বাদাম এবং বীজ
  • মটরশুঁটি, ডাল এবং টফু

উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি যুক্ত খাবার আসলে শরীরকে আরও বেশী লৌহ শোষণ করতে সাহায্য করে, তাই পাশাপাশি এগুলো যোগ করা উপকারী। এর মধ্যে আছেঃ

  • সাইট্রাস ফল এবং ফলের রস
  • স্ট্রবেরি
  • কিউই ফল
  • টমেটো
  • বেল মরিচ/ক্যাপসিকাম

আপনার শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে লৌহ ও ফোলিক অ্যাসিড নিশ্চিত করতে আপনার ধাত্রী/চিকিত্সক ভিটামিন খাওয়ারও পরামর্শ দিবেন। খেয়াল করুন আপনি যাতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিলিগ্রাম লৌহ পেতে পারেন।

প্রথম জন্মপূর্ব সাক্ষাতের সময়, আপনার রক্ত পরীক্ষা করাবেন যাতে আপনার অ্যানিমিয়া আছে কিনা তা ডাক্তার চেক করে দেখতে পারেন। যদি আপনার স্বাভাবিকের চেয়ে কম মাত্রার হিমোগ্লোবিন বা হিমাটোক্রিট থাকে, তবে আপনার লৌহের অভাবজনিত অ্যানিমিয়া থাকতে পারে। আপনার শরীরে লৌহের ঘাটতি নাকি অ্যানিমিয়া হওয়ার অন্য কোন কারণ আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে ডাক্তার আপনার রক্তের অন্যান্য পরীক্ষাগুলি চেক করতে পারেন।

মনে রাখবেন, যদি আপনি গর্ভবতী হন বা গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন, তবে আপনার খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে লৌহ, ফোলিক অ্যাসিড, এবং ভিটামিন বি-১২ থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হোন। আপনার অ্যানিমিয়ার ঝুঁকির ব্যাপারে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন এবং জন্মের পূর্বকালীন প্রথমবার ডাক্তার দেখানোর সময় পরীক্ষা করেছেন কিনা তা নিশ্চিত করুন।

নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করতে যাবেন না এবং যথেষ্ট পরিমাণ লৌহ এবং ফোলিক অ্যাসিড ধারণকারী জন্মপূর্ব ভিটামিন গ্রহণের জন্য আপনার ডাক্তারের নির্দেশাবলী অনুসরণ করুন।