স্তন্যদানের সময় যে সব সমস্যায় পড়তে পারেন নতুন মায়েরা

স্তন্যদানের সময় যে সব সমস্যায় পড়তে পারেন নতুন মায়েরা

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

মাতৃত্ব একটা অনন্য অনুভূতি, কৃতিত্বও বটে। আর, আপনার পরিবারের নতুন খুদে সদস্যটির যত্নআত্তির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল স্তন্যদান। বলা ভালো, আপনার শিশুর সর্বাঙ্গীণ সুস্থতা ও বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো, তার মধ্যে অন্যতম এটি।

তবে এই পর্যায় আনন্দের পাশাপাশি কিছু সমস্যাও বয়ে আনে। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়েরা যে সব সমস্যায় আকছার পড়ে থাকেন তার মধ্যে কয়েকটি নীচে আলোচিত হল।

১। ম্যাস্টাইটিস

এই রোগে স্তন স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যায়, উত্তপ্ত হয়ে যায়, এবং ব্যথা করে।

এটা হয় যখন বুকের দুগ্ধনালিগুলি কোনও কারণে আটকে বা বুজে যায়, এবং সেখান দিয়ে তরল বার হতে পারে না। এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজাত সংক্রমণ, কাজেই এ দিকে যথাযথ নজর দেওয়া প্রয়োজন। না হলে ইনফ্লুয়েঞ্জার মত উপসর্গ বাধিয়ে বসতে পারেন।

কী ভাবে বুঝবেন আপনার ম্যাস্টাইটিস হয়েছে কিনা? নীচে কিছু লক্ষণ দেওয়া হল:

  • ত্বক লাল, ছোপ ছোপ ও অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া
  • জ্বর
  • সর্দি হয়েছে এমন মনে হওয়া
  • সারাক্ষণ ক্লান্তি, শরীর জুড়ে অস্বস্তি, ভারি লাগা

এই সব উপসর্গ দেখা দিলে, ঘাবড়াবেন না। এ সমস্যারও সমাধান আছে। নীচে কিছু উপায় রইল:

  • বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না, চালিয়ে যান
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, বেশি করে ঘুমোন
  • হিট থেরাপি করতে পারেন। একটা তোয়ালে বা নরম কাপড় উষ্ণ গরম জলে ভিজিয়ে স্তনের উপর দিয়ে রাখুন। গরম জলের তাপে নালির ভিতর দিয়ে দুধের চলাচল সহজ হবে।
  • নার্স বা ধাইমাকে বলুন আপনার দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতে। অনেক সময় শিশুকে ধরার পদ্ধতি ঠিক না হওয়ায় এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে, সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  • দুধ খাওয়ানোর পরেও যদি আক্রান্ত স্তন ভরভরতি লাগে, তা হলে হাতের চাপ দিয়ে কিছুটা দুধ বার করে দিন।
  • অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন কি না, কী খাবেন, এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
  • আক্রান্ত স্তনটি মালিশ করুন

২। শিশুর অবস্থানগত ত্রুটি

দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুকে কী ভাবে ধরছেন এবং কোন অবস্থানে রাখছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক মহিলাই শিশুকে ঠিকমতো বুকের সঙ্গে সংযুক্ত করতে না পেরে সমস্যায় পড়েন।

স্তন্যদান বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে “ত্বক সংস্পর্শ” বিষয়টা খুবই উপকারী হতে পারে। এর জন্য, প্রথমে নিজের ঊর্ধ্বাঙ্গের কাপড় খুলে ফেলে আধশোয়া হয়ে বসুন। এর পর শিশুর ডায়াপার বা ন্যাপি ছাড়া অন্য জামা খুলে তাকেও আধশোয়া করে নিজের বুকের কাছে ধরুন। স্তনে মুখ দিতে শিশুর সুবিধা হবে।

৩। অত্যধিক দুধের উৎসারণ

শিশুর যা দরকার শরীরে তার চেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন হওয়ার সমস্যাটিতে পড়েন অনেক মা-ই।

দুধের উৎসারণ বেশি হলে, বুক টাটিয়ে যাওয়া, আকারে বড় হয়ে যাওয়া এবং অস্বস্তি হতে পারে।

এই সমস্যার উপায় হল, প্রতিটি স্তনে দুধ খাওয়ানোর মধ্যে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার ফাঁক রাখুন। অর্থাৎ, শিশুকে যদি ডান স্তনে দুধ খাওয়াতে শুরু করেন, তাহলে পরবর্তী ৩-৪ ঘণ্টায় যখনই তার দুধ খাওয়ার প্রয়োজন হবে তাকে ডান স্তনেই দুধ খাওয়ান। ৪ ঘণ্টা পরে সেই স্তনে দুধের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে, এবং ততক্ষণে আপনার বাম স্তন দুধে পূর্ণ হয়ে যাবে। এ বার, পরবর্তী ৪ ঘণ্টার জন্য বাম স্তনে দুধ খাওয়ান।

আরেকটি উপায় হল, কয়েক মিনিট অন্তর অন্তর এক বুক থেকে আরেক বুকে নিয়ে যেতে থাকা। এতে করে আপনার দু’টি স্তনই একই রকম ভাবে ব্যবহৃত হবে।

৪। স্তনবৃন্ত ফাটা

স্তন্যদানের সময় একটা অন্যতম সাধারণ উপসর্গ হল স্তনবৃন্ত ফেটে যাওয়া। অনেক কারণেই হতে পারে, নীচে তার কয়েকটি দেওয়া হল:

শিশুর স্তনবৃন্ত মুখে নেওয়ার কায়দা সঠিক নয়

শিশুর ফ্রেনিউলাম বা মুখের হাঁয়ে জড়তা আছে

আপনার স্তনবৃন্তে কোনও সংক্রমণ ঘটেছে

শিশুর গলায় বা মুখে থ্রাশ (একধরণের ফাঙ্গাল সংক্রমণ) হয়েছে

স্তনবৃন্ত ফেটে গেলে ল্যানোলিনযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন, বা কয়েক ফোঁটা বুকের দুধ লাগালেও উপকার পাওয়া যাবে। তাতে যদি কাজ না হয়, ধাইমা বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৫। থ্রাশ সংক্রমণ

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পর যদি দু’টি স্তনই ব্যথা করতে থাকে এবং সেই ব্যথা ঘণ্টাখানেক বা তারও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তা হলে থ্রাশ সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে।

ক্যান্ডিডা ফাঙ্গাস নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া থেকে এই সংক্রমণটি হয়। আপনি বা আপনার শিশু যদি সম্প্রতি কড়া অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স করে থাকেন, তাহলে এর সম্ভাবনা বাড়ে। কড়া ওষুধের চাপে রোগসংক্রমণকারী জীবাণুর সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বেশিরভাগ উপকারী ব্যাকটেরিয়াও ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে ক্যান্ডিডা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে।

এই সংক্রমণের ওষুধ হল একটি বিশেষ ধরণের মলম। আক্রান্ত জায়গার উপর পর্যাপ্ত পরিমাণে মলম লাগান, পরে অবশ্যই ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধও খেতে পারেন।

৬। মানসিক চাপ

মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা আমাদের জীবনে খুব সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। খুব বেশি দুশ্চিন্তা থেকে মানসিক অসুস্থতা, অবসাদ ছাড়াও অন্যান্য অসুস্থতাও জন্ম নিতে পারে। সন্তানজন্মের পর আমাদের শরীরের হরমোনগুলো একেবারে উল্টোপাল্টা আচরণ করতে শুরু করে। ফলে এই সময়টাতে আমাদের দুশ্চিন্তা বা অবসাদগ্রস্ত বোধ করার সম্ভাবনা খুবই বেশি।

এ বিষয়টা নানা কারণে হয়ে থাকে। কিছু কারণ নীচে দেওয়া হল:

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসব-পরবর্তী অবসাদ বেশ সাধারণ একটা বিষয়; বহু নতুন মা-ই সন্তানজন্মের পর এই সমস্যায় ভোগেন।

সন্তানজন্মের পর শরীরে এস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরোন-এর মাত্রা কমে যায়, যা থেকে নতুন মায়েদের প্রায়শই মেজাজ ওঠানামা করার সমস্যা হতে থাকে।

সদ্যোজাত সন্তানটি ঠিকমত দুধ খাচ্ছে কিনা, পুষ্টি পাচ্ছে কিনা, এই বিষয়ক দুশ্চিন্তা থেকেও অনেক সময় তীব্র মানসিক চাপের সৃষ্টি হতে পারে।

এই সময়টায় ব্যক্তিগত জীবনে কোনও অশান্তি বা মানসিক টানাপোড়েন মনকে প্রভাবিত করে বেশি।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ আপনার শরীরে দুধের উৎসারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে, এবং পরিমাণে হেরফের ঘটায়।

মানসিক চাপের মোকাবিলা করবেন কী করে?

একাধিক উপায় আছে। জীবনকে চাপমুক্ত রাখতে নীচের পন্থাগুলি নিয়ে দেখতে পারেন:

  • জীবনকে সব সময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখুন
  • দুশ্চিন্তা না করে এই বিষয়টার উপরেই বেশি করে জোর দিন যে স্তন্যদান আপনার ছোট্ট সোনাটিকে সুস্থ-সবল করে গড়ে তোলার এবং তার সঙ্গে একটা অচ্ছেদ্য বন্ধন গড়ে তোলার সবচেয়ে ভালো উপায়
  • ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করুন, ফল ও শাকসবজিতে ভরপুর সুষম আহার করুন
  • স্তন্যদান এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যাগুলি অবহেলা না করে ঠিক সময়ে যথাযথ পরামর্শ বা সাহায্য নিন
  • পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমোন, নিজের যত্ন নিন

৭। স্তন ফুলে যাওয়া

স্তন ফুলে যাওয়া বা আকারে বড় হয়ে যাওয়ার সমস্যা বহু মায়েরই হয়। এর উপসর্গ হল বুক অতিরিক্ত ভরভরতি লাগবে, শক্ত হয়ে যাবে এবং ব্যথা করবে। আগে মনে করা হত দুগ্ধগ্রন্থি ফুলে যাওয়া হল শিশুকে দুধ খাওয়ানো শুরু করার আগের প্রাথমিক পর্যায়, তবে এখন তা আর মনে করা হয় না।

তাহলে এটা কেন হয়?

এর কারণ হল আপনার শিশু দুধ খাওয়ার সময় সঠিক অবস্থানে, অর্থাৎ আধশোয়া অবস্থায় থাকছে না।

শিশুকে যথাসম্ভব স্তনের কাছাকাছি ধরে রাখুন যাতে সে সহজেই আপনার স্তন আঁকড়ে ধরতে পারে। শিশুকে নিয়মিত দুধ খাওয়ান এবং অতিরিক্ত দুধ চেপে বারে করে দিন, তাহলেই ফুলে ওঠা ও ব্যথার হাত থেকে মুক্ত থাকবেন।

৮। অনিয়মিত দুধের প্রবাহ

আপনার দুগ্ধগ্রন্থিগুলির ভিতরে পাতলা পাতলা নালি থাকে যার ভিতর দিয়ে দুধ প্রবাহিত হয়। এই নালিগুলির ভিতরে থাকা দুধ যদি সবটা বেরিয়ে না যায়, তা হলে সেখানে দুধ জমে জমে পরে প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফল হল অনিয়মিত প্রবাহ।

এই পরিস্থিতি এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়টা হল সব সময় আলগা পোশাক ও অন্তর্বাস পরুন যাতে আপনার বুকের উপর কোনও চাপ না পড়ে এবং দুধ বিনা বাধায় প্রবাহিত হতে পারে।

সব সমস্যারই কিন্তু কিছু না কিছু সমাধান আছে। কাজেই দুশ্চিন্তা করবেন না। মন খোলা রাখুন, নিশ্চিন্তে থাকুন এবং সবচেয়ে বড় কথা নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখুন। আপনার ভালো থাকা মানেই কিন্তু শিশুরও ভালো থাকা।