আপনার বাচ্চা কে কি গরুর দুধ খাওয়ানো যাবে?

আপনার বাচ্চা কে কি গরুর দুধ খাওয়ানো যাবে?

 

যখন আপনার বাচ্চা প্রতি মাসে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে, এটা আপনার মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, কোন কোন খাবার তাকে দেয়া দরকার তার পুষ্টির জন্য. বুকের দুধ বাচ্চার পুষ্টি ও শক্তির জন্য সবথেকে ভালো – জন্মের প্রথম ছয় থেকে সাত মাস| এই সময়ের পর বাচ্চার পুষ্টির জন্য প্রয়োজন বুকের দুধের সাথে অন্যান্য খাবার| এই সময় একটি সহজলভ্য খাবার হলো গরুর দুধ| কিন্তু বাচ্চাকে গরুর দুধ খাওয়ানোর আগে কয়েকটি ব্যাপারে আপনাকে সচেতন হতে হবে, আপনার বাচ্চার সুস্বাস্থ্যের জন্য|

কখন থেকে আমার বাচ্চাকে গরুর দুধ খাওয়ানো শুরু করবো?

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাচ্চার একবছর বয়স হলে, তার খাবারের তালিকায় গরুর দুধ যুক্ত করা উচিত. যদিও গরুর দুধে প্রচুর প্রোটিন ও খনিজ পদার্থ থাকে, আপনার বাচ্চার একবছর বয়সের আগে, তাকে গরুর দুধ দেওয়া উচিত নয়| এছাড়াও গরুর দুধের স্বাদের সাথে অভ্যস্ত হতেও আপনার বাচ্চার কিছুটা সময় লাগে| যদি আপনার বাচ্চা এখনো বুকের দুধ খায়, এটা একটা ভালো উপায় হবে, ধীরে ধীরে গরুর দুধ খাওয়ানো বুকের দুধের সাথেই|

আপনি অন্যান খাবারের সাথেও গরুর দুধ মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন| যেমন  ভাত, দই, সুজি, ছাতু, বিস্কুট.

আপনার বাচ্চাকে গরুর দুধ খাওয়ানোর জন্য, অন্য একটি জনপ্রিয় কিন্তু অপ্রচলিত পদ্ধতি হলো – একবার তাকে তার দৈনন্দিন খাবার দেওয়া ও পরেরবার গরুর দুধ খাওয়ানো|

তবে, সবসময়ে খেয়াল রাখতে হবে যে দুধটি বিশুদ্ধকরণ ও ফোটানো হয়েছে ভালো করে। কাঁচা দুধে ক্ষতিকারক জীবাণু থাকতে পারে, যেমন ই. কোলাই, সালমোনেল্লা, যেগুলি আপনার বাচ্চাকে খুব অসুস্থ করে দিতে পারে|

কি কি ঝুঁকি হতে পারে- বাচ্চাকে গরুর দুধ খাওয়ানোতে?

একবছরের কমবয়সী বাচ্চাকে গরুর দুধ খাওয়ালে, কিছু ক্ষতি ও ঝুঁকির সম্ভবনা থাকে। যখন বাচ্চা একটু একটু করে বড় হয়, তার হজম শক্তিও একটু একটু করে পরিণত হয়| যে অতিরিক্ত পরিমান প্রোটিন ও খনিজ গরুর দুধে থাকে, দেখা গেছে যে এগারোমাস বা তার কমবয়সী বাচ্চার ততটা হজম শক্তি থাকেনা। যে জন্য বদহজম হয়| সহ্য করতে পারেনা ল্যাকটোজ/শর্করাটিও| পেট ফাঁপা ও অন্যান বদহজমের লক্ষণগুলি দেখা দেয়।

এছাড়াও গরুর দুধের মধ্যে কিছু প্রয়োজনীয় অনুপুষ্টি খাবারের অভাব থাকে, যেমন ভিটামিন ই, জিঙ্ক, আয়রন ও অন্যান যেগুলো বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ও গঠনে খুবই প্রয়োজন|

সমীক্ষা বলছে,  যে সব বাচ্চারা প্রধানত গরুর দুধ খায়, তাদের আয়রনের অভাব হয়, যার জন্য তাদের শরীরের ক্রমবিকাশে দেরি হয়, পিছিয়ে পড়ে।  পরবর্তীকালে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাইয়েও এটাকে পাল্টানো যায়না|

আয়রনের অভাব একটি মারাত্মক ব্যাপার| আয়রন বা লোহা আমাদের শরীরে লোহিত রক্ত কণিকা তৈরী এবং পরিবহনে সাহায্য করে এবং শরীরের মেরামতি এবং বৃদ্ধিতে সাহায্য করে|

এটা কখনোই উপদেষ্ট নয় যে গরুর দুধ বুকের দুধের সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপক হবে, কারণ শুধু গরুর দুধ খাওয়ালে অনেকগুলি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর জিনিসের ঘাটতি হবে বাচ্চার শরীরে, এবং তার সুস্বাস্থের ব্যাঘাত ঘটবে|যেহেতু এর মধ্যে অনেক পুষ্টিকর জিনিসের অভাব আছে, অন্যান্য আয়রন সমৃদ্ধ খাবার যেমন – খাদ্যশষ্য, বিভিন্ন কলাই, খেজুর, ইত্যাদি ওকে খাওয়ানো সুনিশ্চিত করতে হবে|

 কখন কোন ক্ষেত্রে গরুর দুধ একটি ভালো খাদ্য?

যদি আপনি একবছর পর থেকে গরুর দুধ খাওয়াতে শুরু করেন তাহলে চিন্তার কোনো ব্যাপার নেই| এই বয়সে তার হজম তন্ত্রের বিকাশ যথেষ্ট থাকে, তাতে সে গরুর দুধের মধ্যে থাকা প্রোটিন ও অন্যান পুষ্টিকর জিনিস হজম করতে পারে|

গরুর দুধে প্রচুর পরিমান – ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম ও শর্করা থাকে. এটা আপনার বাচ্চাকে শক্তিশালী হাড়, মজবুত দাঁত এবং পর্যাপ্ত শক্তি দেয়|

এটা সবসময় সুনিশ্চিত করতে হবে যে আপনি আপনার বাচ্চার হজম তন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন না তো – অতিরিক্ত বেশি পরিমান গরুর দুধ খাইয়ে|

সারাদিন চারশো আশি মিলিলিটার পর্যন্ত গরুর দুধ খাওয়ানো নিরাপদ| বাস্তবে অনেকেই বাচ্চাকে অতিরিক্ত পরিমান দুধ খাওয়ান| তাতে বাচ্চার ক্ষতি হয়| রক্তাল্পতা হয়, কারণ অতিরিক্ত দুধ খাওয়ানোর কারণে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার সে আর খেতে পারেনা, পেট ভরে যায়|

কখন দেখা যায় গরুর দুধ বাচ্চাদের সহ্য হচ্ছে না?

যদিও বিরল তবু কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার দুধে এলার্জি (প্রতিক্রিয়াশীলতা)থাকে| শতকরা ১০০টা বাচ্চার মধ্যে দুই বা তিনজনের দুধে প্রতিক্রিয়াশীলতা থাকে| বেশিরভাগ বাচ্চাই এটা কাটিয়ে ওঠে তিন বছর বয়সের মধ্যে| প্রায় সব ক্ষেত্রেই কারণটা জেনেটিক বা বংশগতি বিষয়ক|তবে খুব অল্প বয়সে গরুর দুধের প্রোটিন শরীরে ঢুকলে এই দুধে প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখা দিতে পারে|

যদি আপনার বাচ্চার গরুর দুধে তৈরী গুঁড়ো দুধে কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়া না হয় তাহলে খুব সম্ভব, দুধে প্রতিক্রিয়া হবেনা| কিন্তু যদি আপনি নিশ্চিত না হন, অবশ্যই খেয়াল রাখবেন প্রতিক্রিয়ার সাধারণ লক্ষণ গুলি যেমন – চাকা চাকা দাগ, লাল ফুসকুড়ি, চুলকুনি, ঘা এসব বেরোচ্ছে কিনা| এর কোনটি দেখা দিলে, তাড়াতাড়ি আপনার ডাক্তারের কাছে ওকে নিয়ে যান বা যোগাযোগ করুন|

কয়েক কোথায় বলতে গেলে, গরুর দুধ আপনার বাচ্চার ক্রমবিকাশের জন্য খুবই উপকারী, তখনি,যখন আপনি ওকে এটি দেন সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়। ধীরে ধীরে বাচ্চার খাদ্য তালিকায় এটি যোগ করুন এবং লক্ষ্য রাখুন কোনো প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখা দিচ্ছে কিনা|

মনে রাখবেন, গরুর দুধ কখনোই মা এর দুধের প্রতিস্থাপক হতে পারেনা|