কাজের সময় খাওয়া গর্ভবতী মহিলাদের জন্য জলখাবারের খোঁজখবর

কাজের সময় খাওয়া গর্ভবতী মহিলাদের জন্য জলখাবারের খোঁজখবর

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

সংসার আর চাকরি একসঙ্গে সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। সব দিক গোছাতে গিয়ে বহু মেয়েরই তাই শরীরের যত্নটা ঠিক মত নেওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু দেহের ভিতর যদি আরেকটা প্রাণ বেড়ে উঠতে থাকে তাহলে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে অনেকটা বেশি যত্নবান তো হতেই হবে, কারণ আপনার শরীরই এখন সেই খুদেটির পুষ্টির একমাত্র উৎস। এই সময়টায় দিনে গড়ে ৩০০ ক্যালোরির প্রয়োজন হয় শরীরের। গর্ভাবস্থায় কাজকর্ম চালিয়ে যেতে গেলে তাই খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ এবং পুষ্টিগুণ দুয়ের দিকেই নজর দেওয়া জরুরি।

কাজের জায়গায় ব্যস্ততা থাকলে দুপুরে কিংবা জলখাবারের সময়টায় একেবারে সুষম আহার জোগাড় করাটা সোনার পাথরবাটি মনে হতে পারে। কিন্তু তারও উপায় আছে। ব্যস্ততার সময়ে সঠিক আহারের কিছু উপায় নীচে বাতলানো হল, যাতে শরীরও চনমনে থাকবে, এবং গর্ভস্থ শিশুও পাবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি।

কর্মক্ষেত্রে জলখাবার কী খাবেন?

আহার সুষম রাখার জন্য নানা রকমের খাবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খান, আর নিজের অফিস ডেস্কে কিছু পুষ্টিকর স্ন্যাক্স রেখে দিন। কাজের সময় বমি ভাব হলে ক্র্যাকার-জাতীয় বা কম চড়া স্বাদের বিস্কুট খুব কাজে দেয়; আদা দেওয়া চা বা আদা মেশানো নরম পানীয়ও (যেমন জিঞ্জার এল) ভালো। ব্যাগে সবসময় কিছু মরসুমি ফল রেখে দেবেন। স্বাদ বদল চাইলে সামান্য মশলা কি বাড়িতে বানানো চাটনি বা সস ছড়িয়ে দিন তার উপরে।

কাজের সময় খাওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হল প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া, কারণ গর্ভবতী মহিলাদের শরীরে জলের পরিমাণ পর্যাপ্ত থাকাটা আবশ্যক। সারা দিন সঙ্গে জলের বোতল রাখুন। খরচ বাঁচাতে চাইলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতলে করে জল আনুন, ফুরিয়ে গেলে অফিসে পানীয় জলের কল থেকে ভরে নেবেন। অবশ্যই পরিশ্রুত জল খাবেন।

দুপুরের খাবার সুষম রাখবেন কী ভাবে?

কাজকর্মের সময়ে তাড়াহুড়োটাই রীতি, তাই চটজলদি হাতের কাছে পাওয়া খাবারটা খেয়ে নেওয়াই সবচেয়ে সহজ মনে হয়। তবে মাথায় রাখুন, এই সময়টুকু ব্যবহার করে যাতে অন্তত ২-৩ রকমের তরিতরকারি (শাক-পাতা জাতীয় একটা স্যালাড যেন অবশ্যই থাকে) আর কিছুটা প্রোটিন শরীরে ঢুকিয়ে নিতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবারদাবারের কিছু উদাহরণ এখানে দেওয়া হল :

  • কল বেরোনো ছোলার স্যালাড : স্প্রাউট বা কল বেরোনো ছোলা প্রোটিন আর ফাইবারের উৎস হিসেবে খুব ভালো। তার সঙ্গে টোমাটো বা শশার মত জলীয় সবজি, আলু বা বীটের মত শিকড়জাতীয় সবজি এবং কিছু বাদাম দিয়ে স্যালাড বানিয়ে নিলেই তৈরি চটপট সুষম আহার।
  • রোস্ট করা শিকড়জাতীয় সবজি : সামান্য মশলা দিয়ে মিষ্টি আলু বা যে কোনও ধরনের আলু একটু রোস্ট করে নিয়ে ব্যাগে রাখলে চমৎকার জলখাবার হবে। আলুকাবলি বা অল্প মশলা দিয়ে আলুসেদ্ধও চলতে পারে।
  • শুকনো ফল : গর্ভবতী মায়েদের জন্য সবচেয়ে চটপটে শক্তিবর্ধক খাবার হতে পারে এটি। এই সময়টায় মাঝেমধ্যেই শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া বা কাহিল হয়ে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। হাতের কাছে কিছু আখরোট কী খেজুর রেখে দিলে ফের কাজ চালিয়ে যাওয়ার শক্তিটুকু আহরণ করে নেওয়া যাবে সহজেই।
  • বাদাম : প্রোটিন এবং অন্যান্য নানা পুষ্টিগুণের এক অনবদ্য উৎস বাদাম। চিপস কিংবা অন্য ভাজাভুজির হাজার গুণে বেশি পুষ্টিকর একটা বিকল্প হতে পারে এটি।
  • মুরগির মাংসের স্যালাড : সহজ সরল দুপুরের খাবার হিসেবে সবজির স্যালাডের সঙ্গে প্রোটিন জুড়ে দেওয়াটা বেশ ভালো উপায়। গ্রিল করা মুরগির মাংস টুকরো টুকরো করে স্যালাডে মিশিয়ে নিলেই চটপট তৈরি সুষম স্বাস্থ্যকর আহার।
  • তরকারি-ভাত বা ছোলার ঘুগনি : ফ্রিজে বেঁচে যাওয়া আগের দিনের তরকারি কি মাছ-মাংস তো থাকেই। অল্প তেলে হালকা করে ভাত আর তরকারি একসঙ্গে নেড়েচেড়ে নিলেই তৈরি চটজলদি ফ্রায়েড রাইস। হলুদ দেওয়া তরকারি হলে সবচেয়ে ভালো, স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী রোজের ব্যবহারের এই মশলা। একই রকম ভাবে আগের রাত থেকে ছোলা মটর ভিজিয়ে রেখে সহজে বানিয়ে টিফিনে নিতে পারেন আমিষ বা নিরামিষ ঘুগনি।
  • কুইনোয়া স্যালাড : রোজের হাটেবাজারে সহজলভ্য না হলেও বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা সুপারমার্কেটগুলিতে আজকাল আকছার মেলে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই শস্যদানা। সারা বিশ্বে ক্রমেই ‘সুপারফুড’ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করছে কুইনোয়া। সেদ্ধ করে নিয়ে পছন্দের মশলাপাতি, ক্যাপসিকাম, টোমাটো বা নিজের পছন্দমত সবজি, আর গ্রিল করে নেওয়া মাছ কী মাংসের টুকরো মিশিয়ে সুন্দর স্যালাড তৈরি হতে পারে। মিশিয়ে নিতে পারেন বিশ্ব জুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের আরেক পছন্দের খাবার অ্যাভোকাডো ফলও, তবে সেও মিলবে ঐ সুপারমার্কেটেই।
  • লেমন রাইস বা চিঁড়ের পোলাও : অফিসের টিফিনে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভারি উপযোগী দক্ষিণি রান্না লেমন রাইস বা লেবু ভাত। কারিপাতা, সরষে ফোড়ন আর লেবুর স্বাদের সঙ্গে সঙ্গে অড়হর ডাল বা ছোলার ডাল মিশিয়ে দিলে খেতে ভালো তো হবেই, জুড়বে প্রয়োজনীয় প্রোটিনও। দক্ষিণি স্বাদ মুখে না রুচলে মশলায় একটু হেরফের করে বানিয়ে নিন বাঙালি চিঁড়ের পোলাও।

চটজলদি রাতের খাবার কী বানাবেন?

হাতে কতটা সময় আছে সেই বুঝে আগে থেকে বানিয়ে রাখা বা রান্না করে নেওয়া যাবে এমন কিছু সুষম আহারের তালিকা দেওয়া হল :

  • ভাত, ডাল, একটা সবজি (শাকজাতীয় হলে ভালো), স্যালাড
  • হাতে গড়া রুটি, ডাল, একটা তরকারি, স্যালাড, টকদই বা লস্যি
  • পাঁচমিশেলি ডালের খিচুড়ি আর তরকারি, টকদই ও স্যালাড
  • সবজি দিয়ে খিচুড়ি, টকদই ও স্যালাড
  • সবজি বা মাংস দিয়ে হালকা ফ্রায়েড রাইস বা পোলাও, টকদই বা লস্যি, স্যালাড

কথায় বলে, গর্ভবতী মায়েদের দু’জনের জন্য খেতে হয়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁকে দ্বিগুণ পরিমাণ খেতে হবে বা ক্যালোরি গ্রহণের প্রমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। স্বাভাবিক ওজনের মহিলা, যাঁর বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২৪.৯-এর মধ্যে, তাঁর ওজন গর্ভধারণ কালে ১১.৩ থেকে ১৫.৮ কেজি বাড়ার কথা। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত খেলেই যে বাচ্চা স্বাস্থ্যবান হবে তার কোনও মানে নেই, বরং হিতে বিপরীত হয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। নিজের এবং শিশুর ওজন কতটা বাড়ছে তার হিসেব রাখুন, নিয়মিত ডাক্তার দেখান এবং তাঁর পরামর্শ মতোই খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ হেরফের করুন।

যা যা এড়িয়ে চলবেন :

  • কাঁচা বা আধসেদ্ধ ডিম, মাংস, শাকসবজি, প্যাস্তুরাইজ না করা দুধ এবং নরম মোল্ডে তৈরি চিজ এড়িয়ে চলুন; এগুলি থেকে স্যালমোনেলা এবং লিস্টেরিয়া সংক্রমণ ঘটতে পারে।
  • মদ এবং যে কোনও রকমের মাদক পরিহার করুন।
  • চা-কফি অর্থাৎ ক্যাফেইন যথাসম্ভব কম খান। এক দিনে এক কাপের বেশি খাওয়া উচিত নয়।
  • ক্যান্‌ড্‌ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন; এগুলিতে থাকা প্রিজারভেটিভ শিশুর ক্ষতি করতে পারে।
  • পেঁপে এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে কাঁচা অবস্থায়। এই সবজিটিতে প্যাপাইন নামক একটি এনজাইম থাকে যা ক্ষতিকর। গবেষণায় জানা গিয়েছে যে এটি দেহের ভিতরে প্রোস্ট্যাগল্যান্ডিন বা অক্সিটোসিন-এর মত কাজ করে, এবং গর্ভযন্ত্রণার সময় জরায়ুর পেশীতে টান সৃষ্টি করে যন্ত্রণা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • যে কোনও ভিটামিন বা ভেষজ দ্রব্য ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

অফিসের সহকর্মী বা ক্লায়েন্টদের সঙ্গে বাইরে খেতে যেতে হলে কী করবেন :

ফাস্ট ফুড : চটচলদি খাওয়াদাওয়ার জন্য ফাস্ট ফুড জয়েন্টগুলিতে ঢুকে পড়েন অনেকেই। কিন্তু তার অধিকাংশই অপুষ্টিকর এবং অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটে ভরপুর, তাই যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।

লাঞ্চ মিটিং : কোনও রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ মিটিং থাকলে বাইরে খাওয়াটা একরকম বাধ্যতামূলক, তবে গর্ভবতী অবস্থায় নিজের এবং শিশুর স্বাস্থ্য সবার আগে। মাছ, মুরগি বা পাঁঠার মাংস অর্ডার করলে ওয়েটারকে স্পষ্ট ভাবে বলে দিন খাবার যাতে ভালো ভাবে সিদ্ধ বা রান্না করা হয়। আধসেদ্ধ বা কাঁচা মাছ/সামুদ্রিক জীব, কাঁচা উপকরণে তৈরি সস কিংবা কাঁচা ডিম দিয়ে তৈরি কেক-পেস্ট্রি বা মিষ্টি পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন।

মনে রাখবেন, অন্য কোনও গর্ভবতী মহিলার জন্য যা স্বাস্থ্যকর আপনার জন্যও সেটাই স্বাস্থ্যকর না-ই হতে পারে। তাই সবার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, এবং তিনি আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে যা যা পরামর্শ দেবেন তা পালন করে চলুন।

গর্ভবতী অবস্থায় ভারতীয় খাবারের বিকল্প নেই; আপনার ও আপনার শিশুর জন্য সব রকমের প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণে ভরপুর আমাদের দেশের খাদ্যশৈলী। গর্ভবতী মহিলাদের সুষম আহারে পাঁচটি মৌলিক ‘ফুড গ্রুপ’ থেকে কিছু কিছু রাখা জরুরি; এগুলি হল শস্য, শাকসবজি, ফল, দুধ এবং মাছ-মাংস। নিজের হাতে সবকিছু কুলিয়ে না উঠতে পারলে রান্নার লোকের বা বাড়িতে তৈরি হোম ডেলিভারি সিস্টেমের সাহায্য নিন। এই সময়টায় ক্লান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক, তাই আপনার বিশ্রামের জন্য সময় বার করতে এমন একটা ব্যবস্থা রাখাই যুক্তিযুক্ত হবে। তবে হ্যাঁ, আপনার কী কী খাওয়া দরকার এবং কী কী বারণ তা তাঁদের বিস্তারিত ভাবে বুঝিয়ে দিতে ভুলবেন না যেন।