মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশন: কখন ও কেন

মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশন: কখন ও কেন

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

সারা বিশ্বেই শিশুর সর্বশ্রেষ্ঠ পুষ্টির উৎস হিসেবে মায়ের দুধ স্বীকৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশই হল প্রসবের পর ৬ মাস শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো, মা ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্যের পক্ষেই যা উপকারী। কিন্তু কিছু কিছু পরিস্থিতিতে মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে অসমর্থ হন। এই সব ক্ষেত্রে, মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশন শিশুকে যথাযথ পুষ্টি দেওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।

মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশন বলতে কী বোঝায়?

এর অর্থ হল বুকে চাপ দিয়ে দুধ বার করা এবং শিশুকে পরে খাওয়ানোর জন্য সংরক্ষণ করে রাখা।

দুধ নিষ্কাশন করবেন কেন?

আপনার সদ্যোজাতটিকে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় নিঃসন্দেহে স্তন্যদান। আপনার শিশুকে তার জন্য সবচেয়ে জরুরি পৌষ্টিক উপাদানগুলি সরবরাহ করার পাশাপাশি, স্তন্যদান আপনার ও শিশুর মধ্যে বন্ধনটি সুদৃঢ় করে গড়ে তুলতেও সাহায্য করে।

তা সত্ত্বেও, এমন পরিস্থিতিও আসতে পারে যেখানে স্তন্যদান সম্ভব নয়। তার কিছু উদাহরণ নীচে দেওয়া হল:

  • জীবিকার প্রয়োজনে মাকে বাইরে যেতে হচ্ছে
  • শিশু অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি এবং মায়ের থেকে দূরে আছে
  • সদ্যোজাত ঠিক মত দুধ চুষে খেতে পারছে না
  • শিশুকে কোনও কারণে আয়া বা মা ছাড়া অন্য কারও কাছে রাখতে হয়েছে
  • মায়ের দুগ্ধনালী বুজে গিয়েছে বা অবরুদ্ধ হয়েছে
  • নতুন মায়ের স্তনবৃন্তে ফাটল ধরেছে বা তাঁর ম্যাসটাইটিসের মত কোনও সংক্রমণ হয়েছে
  • মায়ের শরীরে দুধের উৎসারণ কম হচ্ছে
  • দুধ খাওয়ানোর মাঝে মাঝে স্তন ফুলে উঠছে

দুধ নিষ্কাশনের জন্য পালনীয় কিছু সাবধানতা

স্তন্যদুগ্ধ নিষ্কাশনের জন্য যে কোনও পন্থা অবলম্বনের জন্য কিছু সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিধি অক্ষরে অক্ষরে পালন করা দরকার। এগুলি না মানলে শিশুর সংক্রমণের আশঙ্কা কিন্তু খুবই বেশি। নীচে এমন কিছু নিয়ম দেওয়া হল:

  • গরম জলে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোওয়া
  • নিষ্কাশিত দুধ রাখার কাপ বা বোতল (ঢাকনি-সহ) স্টেরিলাইজ করা আবশ্যক
  • পাত্রের ভিতরে যাতে কোনও ভাবে হাত না লেগে যায় তা খেয়াল রাখা
  • স্তন্যদুগ্ধের পাম্প (যখনই ব্যবহৃত হবে) এবং তার আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সমস্ত স্টেরিলাইজ করা আবশ্যক
  • দুধ নিষ্কাশনের সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা

নিষ্কাশনের আগে যে ৫টি জিনিস মাথায় রাখবেন

  • নিষ্কাশনের জন্য আরামদায়ক জায়গায় শিথিল হয়ে বসুন
  • নিষ্কাশনের আগে ঈষদুষ্ণ গরম জলে স্নান করলে বা গরম কোনও পানীয় খেলে সুবিধা হতে পারে
  • স্তনের উপর গরম করা তোয়ালে রাখলে নিষ্কাশনের প্রক্রিয়া সহজতর হবে
  • নিষ্কাশনের আগে অবশ্যই কিছু খেয়ে নেবেন
  • এই প্রক্রিয়ার কোনও পর্যায়েই ব্যথা লাগার কথা নয়
  • কিছু ক্ষেত্রে, শিশুর কথা ভাবলে, বা শিশুকে কোলে নিয়ে রাখলে, দুধ উৎসারণের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াটিতে সাহায্য হয়

মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশনের নানান পন্থা

মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশনের নানা রকম পন্থা আছে। নীচে সেগুলি বিস্তারিত বলা হল:

১। হাত দিয়ে নিষ্কাশন

একজন নতুন মায়ের স্তন্যদানের অভ্যাস যথাযথ ভাবে তৈরি হতে সাধারণতঃ সপ্তাহখানেক সময় লাগে। এর আগে স্তন্যদুগ্ধ নিষ্কাশন করতে অসুবিধা হতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। তাছাড়া, সময় ও অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে নিষ্কাশিত দুধের পরিমাণও বাড়বে। হাত দিয়ে নিষ্কাশন করলে স্তনের একটা নির্দিষ্ট অংশ থেকেই দুধ উৎসারিত হয়। কিছু পরিস্থিতিতে, যেমন অবরুদ্ধ দুগ্ধনালীর সমস্যায় এতে দুধ উৎসারণ সহজ হতে পারে।

নতুন মায়ের পক্ষে হাসপাতালের ধাইমা বা নার্সদের থেকে দুধ নিষ্কাশন শেখাই সবচেয়ে শ্রেয়।

তবে নীচের পরামর্শগুলি মেনে চললে সুবিধা হবে:

  • প্রক্রিয়া শুরু করার আগে অবশ্যই হাত ধুয়ে নেবেন
  • স্তনের ঠিক নীচে একটি স্টেরিলাইজ করা কাপ বা বোতল ধরে রাখুন যাতে বেরিয়ে আসা দুধ সেখানে জমা হতে পারে
  • প্রক্রিয়ার শুরুতে, আলতো করে স্তনে মালিশ করতে থাকুন। এতে দুধ প্রবাহিত হতে সুবিধা হবে
  • এক হাত দিয়ে স্তনের নীচের দিক তুলে ধরুন, অন্য হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনী অর্ধচন্দ্রের আকারে প্রসারিত করে স্তনের উপর দিকে রাখুন
  • স্তনবৃন্তের চারপাশের গাঢ় রঙের অংশটির দু’পাশে বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে আলতো আলতো করে চাপ দিন, তবে এই অংশের উপরে চাপ দেবেন না। বৃন্তের উপর চাপ দেবেন না, এতে ব্যথা লাগতে পারে। এই প্রক্রিয়া ঠিকমত চললে কোনও ব্যথা লাগার কথা নয়
  • চাপুন, ছাড়ুন, আবার চাপুন। এই ভাবে একটা ছন্দ তৈরি করে নিন। চেষ্টা করুন আঙুল যাতে পিছলে না যায়
  • প্রথমে বিন্দু বিন্দু করে জমা হবে, তারপর দুধ প্রবাহিত হতে শুরু করবে
  • প্রবাহের গতি কমে এলে আঙুলগুলি স্তনের অন্য কোনও অংশে নিয়ে গিয়ে আবার একই জিনিস করুন
  • এক স্তনের প্রবাহ একেবারে কমে এলে, অন্য স্তনে এই প্রক্রিয়া শুরু করুন। তবে, অন্য স্তনে যাওয়ার আগে একটি স্তন সম্পূর্ণ খালি করে নেওয়াই শ্রেয়
  • শরীরে দুধের উৎপাদন কম থাকার কারণে যদি নিষ্কাসন করতে হয়, তাহলে দুই স্তন থেকেই দুধ পুরোপুরি বার করে নেওয়া ভালো, দিনে পর পর ২-৩ বার

২। পাম্পের মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধ নিষ্কাশন

  • ব্রেস্ট পাম্প নানা ধরণের পাওয়া যায়, ম্যানুয়াল বা হাতে চালানোও হয়, আবার ইলেকট্রিকও। এক এবং দুই কাপ-বিশিষ্ট পাম্প পাওয়া যায়। ফানেলের আলাদা আলাদা সাইজ-ও পেয়ে যেতে পারেন, আপনার স্তনের মাপমত কিনে নিতে পারবেন। আপনার পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী এদের মধ্যে থেকে যে কোনও একটি বেছে নিন
  • যাঁদের যমজ শিশু রয়েছে বা দুই স্তন থেকেই অতিরিক্ত দুধের প্রবাহ হচ্ছে, তাঁদের জন্য দুই কাপ-বিশিষ্ট পাম্প উপযুক্ত হবে
  • প্রসবের ৪-৫ দিন পর থেকেই ব্রেস্ট পাম্প কাজে দেয়, তার আগে হাত দিয়ে নিষ্কাশন করাই শ্রেয়
  • সুযোগ থাকলে কেনার আগে ব্রেস্ট পাম্পের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে নেবেন

ব্রেস্ট পাম্পের পরিচ্ছন্নতা-সংক্রান্ত কিছু পরামর্শ

ব্যবহারের আগে

  • সাবান ও গরম জল দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া
  • পাম্পটি আগাপাশতলা ধোয়া এবং স্টেরিলাইজ করা, একেবারে নতুন হলেও
  • পাম্পটি অ্যাসেম্বল করার সময় তার সঙ্গে দেওয়া নির্দেশিকাটি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করুন
  • ইলেকট্রিক পাম্প হলে, সবচেয়ে কম সাকশন্‌ মোডে রাখুন
  • স্তনে কাপটি আটকানোর সময় খেয়াল রাখুন আপনার বৃন্তটি যেন কাপের ঠিক মাঝখানে থাকে, এবং আপনার ত্বক ও কাপ যেন যথাসম্ভব স্পর্শ করে থাকে
  • ম্যানুয়াল পাম্পের ক্ষেত্রে, ধীরে ধীরে সাকশন যন্ত্রটি পাম্প করতে শুরু করুন
  • ইলেকট্রিক পাম্পের ক্ষেত্রে, যন্ত্রটি সুইচ অন করে নিলেই চলবে (নির্দেশিকা অনুযায়ী)

ব্যবহারের পরে

  • বাসন ধোয়ার সাবান ও বুরুশ দিয়ে পাম্পটির প্রতিটি অংশ ধরে ধরে পরিষ্কার করুন, সাবান পাম্প পরিষ্কারের জন্য আলাদা রাখবেন, এবং অন্য বাসন ধোয়ায় ব্যবহৃত বুরুশ এখানে ব্যবহার করবেন না
  • পাম্পের প্রতিটি অংশ গরম জল দিয়ে আলাদা আলাদা করে ধোবেন এবং পরে টিসু পেপার বা তোয়ালে দিয়ে শুকনো করে মুছবেন
  • শুকনো পাম্প কিটটি এরপর ভালো করে মুড়ে সুরক্ষিত জায়গায় তুলে রাখুন, যাতে কোনও সংক্রমণ ছড়াতে না পারে

মাতৃদুগ্ধ সংরক্ষণ করা

নিষ্কাশনের সঙ্গে সঙ্গে মাতৃদুগ্ধ রেফ্রিজারেটরে ঢুকিয়ে ফেলা সবচেয়ে ভালো। ফ্রিজে রাখলে স্তন্যদুগ্ধের কিছু পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় বটে, কিন্তু তা সত্ত্বেও শিশুর জন্য সেটিই সর্বোত্তম পুষ্টির উৎস।

নিষ্কাশিত দুধ সিল করা এবং স্টেরিলাইজ করা পাত্রে বা বোতলে করে সংরক্ষণ করতে হবে। ফিডিং বোতলের শুধু নিপলটি লাগিয়ে রাখলে হবে না, তাতে সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায়। বোতলে সব সময় ঢাকনি লাগিয়ে রাখবেন।

নিষ্কাশিত স্তন্যদুগ্ধের রঙ ও ঘনত্ব অন্য রকম লাগলে ঘাবড়ে যাবেন না, এই বিষয়গুলি প্রত্যেক মহিলার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা হতে পারে। আর, দুধের উপর মালাই বা সর পড়লেও চিন্তার কিছু নেই, এটাও একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়, ক্ষতিকর কিছু নয়।

সদ্য নিষ্কাশিত স্তন্যদুগ্ধ সংরক্ষণ করার কিছু নিয়মনির্দেশ এখানে দেওয়া হল:

কোথায়? কতক্ষণ তাজা থাকে?
ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) মোটামুটি ৬ ঘণ্টা
বরফ বাক্সে প্রায় ২৪ ঘণ্টা
রেফ্রিজারেটর (৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে, দরজায় নয়, ফ্রিজের একেবারে পিছন দিকে) ২-৫ দিন
রেফ্রিজারেটরের ফ্রিজার ২ সপ্তাহ
রেফ্রিজারেটরে আলাদা দরজাওয়ালা ফ্রিজার ৩ মাস
ডিপ ফ্রিজার ৬-১২ মাস

নিষ্কাশিত দুধ ফের গরম করে শিশুকে খাওয়ানো

শিশুর জন্য তাজা মাতৃদুগ্ধই তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর। সদ্য নিষ্কাশিত দুধ তখন তখনই খাওয়ালে আর গরম করার দরকার নেই, স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই খাওয়ানো যেতে পারে। তবে পরে খাওয়ানোর জন্য রাখতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে ঢোকান।

ফ্রিজে রাখা স্তন্যদুগ্ধ গরম করা

  • ঠান্ডা স্তন্যদুগ্ধ গরম করতে শিশুকে খাওয়ানোর ঠিক আগে কিছুক্ষণের জন্য একটি গরম জলের পাত্রে বোতলটি ডুবিয়ে রাখুন
  • গরম জলের কলের তলায় রেখেও বোতলের ঠান্ডা কাটানো যেতে পারে
  • বেশি গরম করবেন না, তাতে কিছু পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। ১০ মিনিটের বেশি সময় ধরে গরম করা অনুচিত
  • স্তন্যদুগ্ধ কখনওই মাইক্রোওয়েভে বা সরাসরি স্টোভে বসিয়ে গরম করবেন না। তাতে পুষ্টিগুণ নষ্ট তো হয়েই, শিশুর জিভ পুড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে
  • একবার গরম করা স্তন্যদুগ্ধ কোনও পরিস্থিতিতেই ফের গরম করে ব্যবহার করবেন না

জমানো স্তন্যদুগ্ধ

  • জমে যাওয়া স্তন্যদুগ্ধ ফ্রিজে রেখে গলিয়ে আরও ২৪ ঘণ্টার জন্য সংরক্ষণ করা যায় (উপরে সংরক্ষণের নিয়ম দেখুন)
  • জমে যাওয়া স্তন্যদুগ্ধ গরম জলের পাত্রে রেখেও গলানো যায়; সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে খাইয়ে দেওয়া উচিত, এবং যদি কিছু বেঁচে যায় ফেলে দেবেন
  • ফ্রিজে রাখা স্তন্যদুগ্ধ গরম করার (উপরে বর্ণিত) পদ্ধতিতেই গলানো স্তন্যদুগ্ধও গরম করা যাবে (শুধুমাত্র একবারই)
  • একবার গরম করা হলে সেটা পুনরায় গরম বা ব্যবহার করবেন না

পরিশেষে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে কবজিতে কয়েক ফোঁটা দুধ ফেলে দুধের তাপমাত্রাটা একবার দেখে নিন।

অতএব, শিশুর থেকে দূরে থাকতে হলে অযথা দুশ্চিন্তা করবেন না। মাথা ঠান্ডা রেখে, উপরে দেওয়া নিয়মগুলো মেনে চলুন। আপনার স্নেহের পুত্তলিটি আপনার অবর্তমানেও যে সর্বোচ্চ পুষ্টি পাচ্ছে, সেটা নিশ্চিত করতে কোনও অসুবিধাই হবে না।