শিশুর প্রসবকালীন ওজন কম হলে কীভাবে খাওয়াবেন

শিশুর প্রসবকালীন ওজন কম হলে কীভাবে খাওয়াবেন

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে  সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

চিকিৎসকের কথা অক্ষরে অক্ষরে মানলেন, সব নিয়ম ঠিকঠাক পালন করলেন, সবরকম ব্যবস্থা নিলেন – তা সত্ত্বেও কিন্তু শিশুজন্ম পরিকল্পনামাফিক না-ই হতে পারে। প্রসবের সময়ে আপনার শিশুর ওজন যদি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়, তবে তাকে সুস্থ স্বাভাবিক একটা জীবন দিতে আপনাকে কিন্তু অতিরিক্ত যত্ন ও ব্যবস্থা নিতেই হবে। কম প্রসবকালীন ওজনের শিশু বলতে তাদেরই বোঝায় যাদের ওজন প্রসবের সময় ২৫০০ গ্রাম/২.৫ কিলোগ্রামের কম হয়।

তার উপর, এই সব ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক কাল পূরণ করেই যে জন্ম হবে তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই; নির্ধারিত সময়ের আগেও হতে পারে। বস্তুত, প্রসবের সময় শিশুর ওজন কম থাকার অন্যতম কারণই হল গর্ভাবস্থার নির্ধারিত কাল শেষ হওয়ার আগেই কোনও কারণে শিশু ভূমিষ্ঠ হয়ে যাওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই শিশুরা অপরিণত গর্ভাবস্থারই ফসল, তবে অপরিণত গর্ভাবস্থাই এই ঘটনার একমাত্র কারণ নয়।

প্রতি বছর, সারা বিশ্বে ২ কোটিরও বেশি শিশু আড়াই কেজির কম ওজন নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। এদের মধ্যে ৯৬% ভূমিষ্ঠ হয় ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের নিম্নলিখিত সমস্যাগুলিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি:

  • সার্বিকভাবে বিকাশগত সমস্যা
  • সংক্রামক রোগ
  • বাড়বৃদ্ধিতে দেরি
  • মৃত্যু

আপনার শিশুটির প্রসবকালীন ওজন যদি কম থেকে থাকে, তাহলে তাকে কতটা কী খাওয়াতে হবে সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা তার স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য আবশ্যক।

কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের রকমফের

  • পূর্ণ সময়ের কম প্রসবকালীন ওজনের শিশু : যাদের ওজন ২ থেকে ২.৫ কেজি
  • অপরিণত কম প্রসবকালীন ওজনের শিশু (৩২ থেকে ৩৬ সপ্তাহ) : যাদের ওজন ১.৫ থেকে ২ কেজি
  • অপরিণত কম প্রসবকালীন ওজনের শিশু (৩২ সপ্তাহের কম) : যাদের ওজন ১ থেকে ১.৫ কেজি
  • অপরিণত কম প্রসবকালীন ওজনের শিশু (২৮ সপ্তাহের কম) : যাদের ওজন ১ কেজিরও কম (অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশু)

সাধারণতঃ, উপরের প্রতিটি রকমের শিশুরই অন্যান্য কোনও সমস্যা থাকে যার আশু চিকিৎসা প্রয়োজন, এমনকি হাসপাতালে রাখার দরকারও হতে পারে। কাজেই, শিশুর যত্ন কীভাবে নেবেন তা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত পরামর্শ করেই স্থির করুন।

খাওয়ানোর উপর এতটা গুরুত্ব কেন

অন্য কোনও গুরুতর সমস্যাও যদি না থাকে, তাহলেও কিন্তু আপনার কম প্রসবকালীন শিশুকে খাওয়ানোটা রীতিমত যুদ্ধ বলে মনে হতে পারে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, শিশুর পুষ্টিসাধনের সবচেয়ে ভালো উপায় হল স্তন্যদান। শিশু কম প্রসবকালীন ওজনের হলে তাকে খাওয়ানোর জন্য একটা নিয়মিত সময়সারণী বজায় রাখা এবং কতটা কী খাওয়ানো হচ্ছে তার হিসেব রাখা খুব জরুরি। এর জন্য বাড়িতে ক্যালেন্ডার বা ওয়াইটবোর্ড ঝুলিয়ে তাতে দাগ দিয়ে দিয়ে হিসেব রাখতে পারেন। প্রতিবার খাওয়ানোর সময় শিশু কতটা করে খাচ্ছে সেটা খেয়াল রাখুন। দুধ খাওয়ানোর সময় দুধের একেবারে নিখুঁত পরিমাণ হিসেব করা সম্ভব নয়, কাজেই শিশু কতটা সময় নিচ্ছে সেটার হিসেব রাখুন।

স্তন্যদানের গুরুত্ব

আপনার ও শিশুর উভয়ের জন্যই স্তন্যদান প্রভূত উপকারী। শিশুর জীবনের প্রথম ৬ মাসে যা যা পৌষ্টিক উপাদান প্রয়োজন তার সবটাই আপনার বুকের দুধে বর্তমান। অন্যান্য সুফলের পাশাপাশি এটি আপনার শিশুকে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মত অসুখের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে। তাছাড়া গবেষণায় প্রকাশ, জন্মের প্রথম দিন থেকেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে শুরু করলে সদ্যোজাত স্তরে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়, যা কিনা কম প্রসবকালীন শিশুদের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় আশঙ্কা।

যে মায়েরা কম ওজনের শিশু প্রসব করেছেন তাঁদের জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে স্তন্যদান শুরু করা দরকার। অতি কম ওজনের শিশুদের ক্ষেত্রে, রোজ কেজি প্রতি ১০ মিলিলিটার হিসাবে তরল খাদ্য (প্রধানত স্তন্যদুগ্ধ) শিশুর শরীরে প্রবেশ করাতে হবে; ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন এন্টেরাল ফিড অর্থাৎ কৃত্রিম উপায়ে অন্ত্রের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত করে, এবং তার পর থেকে ইন্ট্রাভেনাস অর্থাৎ শিরার ভিতর দিয়ে চ্যানেলের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী এই শিশুদের প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাইয়ে রাখতে হবে। নীচে কম ও অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের খাওয়ানোর ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ একটু বিস্তারে দেখে নেওয়া যাক।

কী খাওয়াবেন?

আগেই বলা হয়েছে, কম ও অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের জন্য মায়ের নিজের দুধই সর্বশ্রেষ্ঠ। তবে কোনও কারণে যদি তা সম্ভব না হয়, এই শিশুদের কোনও দাতার থেকে নেওয়া স্তন্যদুগ্ধ দেওয়া দরকার। যে সব ক্ষেত্রে কোনও ভাবেই স্তন্যদুগ্ধ জোগাড় করা যাবে না, তাহলে ৬ মাস পর্যন্ত নির্দিষ্ট ধরণের ফর্মুলা দুধ খাওয়াতে হবে।

কোনও কোনও সময়ে নিয়মিত ফর্মুলা খাওয়ানোর পরেও অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুর ওজন বাড়ে না। সে ক্ষেত্রে অপরিণত শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ ফর্মুলা খাওয়াতে হবে।

আবার, মায়ের দুধ খেয়েও যে সব অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুর ওজন বাড়ে না তাদের স্তন্যদুগ্ধে তৈরি বলবর্ধক বা হিউম্যান মিল্ক ফর্টিফায়ার দেওয়া দরকার। এসব ক্ষেত্রে গরুর দুধে তৈরি বলবর্ধক নিয়মিত ভাবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

কম ও অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের কত ঘন ঘন খাওয়াবেন

এই শিশুদের মধ্যে যারা স্তন্যপান করছে, তাদের প্রতি ৩ ঘণ্টা, এবং কখনও কখনও ২ ঘণ্টা অন্তর খাওয়ানো উচিত। তার জন্য শিশুকে যদি গভীর ঘুম থেকেও তুলতে হয় তাই করতে হবে।

যে সব ক্ষেত্রে শিশুকে আংশিক ভাবে বা পুরোপুরি কৃত্রিম উপায়ে খাওয়ানো হচ্ছে, সেখানে শিশুর খিদে অনুযায়ী কতবার খাওয়াবেন তা ঠিক হবে। শিশু যদি ৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ঘুমোতে থাকে তবে অবশ্য এটা প্রযোজ্য নয়। কৃত্রিম উপায়ে খাওয়ানো হচ্ছে এমন অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুর ক্ষেত্রে, দিনপ্রতি খাওয়ার পরিমাণ ৩০ মিলিলিটার/কেজি অবধি বাড়ানো যেতে পারে; অবশ্যই শিশুর কতটা সহ্য হচ্ছে বা হচ্ছে না তার দিকে কড়া নজর রাখতে হবে।

অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের জন্য পরিপূরক

মায়ের বুকের দুধ ছাড়াও এই শিশুদের ক্ষেত্রে এই আহার-পরিপূরকগুলি জরুরি:

  • ভিটামিন ডি: দিন প্রতি ৪০০ থেকে ১০০০ আইইউ ৬ মাস পর্যন্ত
  • ক্যালসিয়াম: দিন প্রতি ১২০ থেকে ১৪০ মিলিগ্রাম/কেজি প্রথম কয়েক মাসে
  • ফসফরাস: দিন প্রতি ৬০ থেকে ৯০ মিলিগ্রাম/কেজি প্রথম কয়েক মাসে
  • লোহা: দিন প্রতি ২ থেকে ৪ মিলিগ্রাম/কেজি ২য় সপ্তাহ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত

অতি কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুর যত্ন নেবেন কীভাবে

উপরে বর্ণিত আহার-সংক্রান্ত সুপারিশগুলি ছাড়াও শিশুর যত্ন নেওয়ার সময় কিছু নিয়ম মেনে চললে উপকার হবে।

  • ত্বক স্পর্শ:  শিশুকে যথাসম্ভব নিজের গায়ের সঙ্গে সঙ্গে রাখুন ও স্পর্শ করুন; এতে তার বৃদ্ধি হবে তাড়াতাড়ি, শ্বাসের হার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ঘুমও ভালো হবে। ত্বক স্পর্শের আরও একটা ভালো উপায় হল মালিশ করা, বিশেষ করে তেল দিয়ে।
  • একসাথে শোয়া: শিশুর সঙ্গে একসাথে শুলে স্তন্যদান করতে সুবিধা তো হবেই, শিশুর সঙ্গে আপনার বন্ধনটিও দৃঢ় হবে আরও।
  • বাড়বৃদ্ধির হিসেব রাখা: শিশু কতটা বাড়ল তার যথাসম্ভব পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখতে হবে; তাই নিয়মিত শিশু বিশেষজ্ঞর সঙ্গে দেখা করাটা অবশ্যকর্তব্য। সময়মতো সমস্ত প্রয়োজনীয় টীকা দিইয়ে নেবেন। যদি বাড়বৃদ্ধি প্রত্যাশামত না হয়, পৌষ্টিক উপাদানের মাত্রার হেরফের ঘটিয়ে দেখুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, শিশুর সব রকম চাহিদা ও সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে সজাগ থাকুন; সেটা তার বাড়বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করতে অনেকটাই সাহায্য করবে।

উপসংহার

কম প্রসবকালীন ওজনের শিশুদের খাওয়ানো ও যত্ন করা কঠিন বটে, কিন্তু সদিচ্ছা ও ভালোবাসা থাকলে মোটেই অসম্ভব নয়। সঠিক পরামর্শ ও নিয়মকানুন মেনে চললে, শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালোটা বেছে নিতে কোনও অসুবিধাই হবে না বাবা-মার।