অপরিণত শিশুদের জন্য হিউম্যান মিল্ক ফর্টিফায়ার কতটা জরুরি?

অপরিণত শিশুদের জন্য হিউম্যান মিল্ক ফর্টিফায়ার কতটা জরুরি?

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

সদ্যোজাত শিশুর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ খাদ্য মায়ের বুকের দুধ। কিন্তু যে শিশুদের জন্ম হয়ে যায় নির্ধারিত সময়ের আগেই, তাদের জন্য কি স্বাভাবিক শিশুদের মতই শুধু মাতৃদুগ্ধ পর্যাপ্ত, নাকি তাদের দরকার অতিরিক্ত পৌষ্টিক সহায়তা, যা হিউম্যান মিল্ক ফর্টিফায়ার (এইচএমএফ) বা মাতৃদুগ্ধের বলবর্ধক উপাদান, যেমনটা সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দাবি করা হচ্ছ্বে? নীচে এই বিতর্কের সব দিক খতিয়ে আমরা দেখে নেব আপনার শিশুর জন্য কোন পন্থাটি সবচেয়ে ভালো।

মাতৃদুগ্ধ

মায়ের বুকের দুধ নিঃসন্দেহে শিশুর পুষ্টির সবচেয়ে ভালো উৎস; অধিকাংশ চিকিৎসকই এতে সায় দেবেন। মায়ের দুধ শিশুকে একেবারে তার যতটা দরকার সেই সেই পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেল ও নানা পৌষ্টিক উপাদান জোগায়। শুধু শিশুকে পুষ্টি জোগানোই নয়, মায়ের দুধ তাকে একাধিক প্রাণঘাতী অসুখের হাত থেকেও সুরক্ষিত রাখে। এটা অপরিণত বা সময়ের আগে জন্মানো শিশুদের ক্ষেত্রে আরও বেশি করে সত্য।

নেক্রোটাইজিং এন্টেরোকোলাইটিস (Necrotizing Enterocolitis or NEC) নামে এক ভয়ানক প্রাণঘাতী রোগ থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেয় মাতৃদুগ্ধ। অপরিণত শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ খুব বেশি। এছাড়াও মায়ের দুধে একাধিক অ্যান্টিবডি থাকে যা শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শিশুকে নানা সংক্রমণ ও অ্যালার্জির হাত থেকে রক্ষা করে।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মায়ের দুধ খাওয়ার সঙ্গে শিশুদের মধ্যে বৌদ্ধিক উৎকর্ষের সম্পর্ক রয়েছে। মায়ের দুধ শিশুকে পরবর্তী জীবনে ডায়াবেটিসের মত একাধিক গুরুতর শারীরিক সমস্যার হাত থেকে সুরক্ষা দেয়, তাছাড়া মায়ের সঙ্গে শিশুর বন্ধন আরও দৃঢ় করে।

শুধু শিশু নয়, স্তন্যদান সাহায্য করে মাকেও। স্তন্যদান করানোর সময় প্রচুর শক্তিক্ষয় হয়, আর তাই গর্ভাবস্থাকালীন মেদ ঝরিয়ে ফেলাটা অনেক সহজ হয় মায়ের পক্ষে। এর ফলে মায়ের জরায়ু তার স্বাভাবিক আয়তনে ফিরে আসে। এটি মাতৃদেহে স্তন ক্যান্সার এবং অস্টেওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয় রোধ করে।

কোনও কারণে যদি মায়ের দুধ শিশুকে না দেওয়া যায়, তবে কোনও দাতার থেকে স্তন্যদুগ্ধ নেওয়া যেতে পারে। আজকাল মিল্ক ব্যাঙ্ক জাতীয় পরিষেবাগুলিতে এইভাবে স্তন্যদুগ্ধ পাওয়া যায়।

অপরিণত শিশুদের অতিরিক্ত পৌষ্টিক চাহিদা

কোনও কোনও ক্ষেত্রে, যেমন শিশু যদি অপরিণত, অসুস্থ বা কম ওজনের হয়, তা হলে শুধু মায়ের দুধ তার পৌষ্টিক চাহিদার জন্য পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। বেশ কিছু গবেষণায় প্রকাশ, অপরিণত শিশুদের যে পরিমাণ পুষ্টি প্রয়োজন তা শুধু মাতৃদুগ্ধে জোগানো সম্ভব নয়।

কখনও কখনও শিশুর হাড় শক্ত করার জন্য আলাদা করে ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি পরিপূরক হিসেবে দেহে ঢোকানোর দরকার হয়। কিছু ক্ষেত্রে, মায়ের নিজেরই কিছু ভিটামিন খামতি থাকতে পারে যার কারণে তিনি শিশুর ঠিকমত পুষ্টিসাধন করতে পারেন না।

এর মানে এই নয় যে সব অপরিণত শিশুরই অতিরিক্ত পরিপূরক লাগে। মাতৃদুগ্ধে মেটে না এমন পুষ্টির চাহিদা খুব কম সংখ্যক অপরিণত শিশুরই থাকে। এ বিষয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার আছে শুধুমাত্র অপরিণত সদ্যোজাত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসক, অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের, কারণ সদ্যোজাতর আহারে অতিরিক্ত কিছু ঢোকানো হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও জ্ঞান সব চিকিৎসকের থাকে না।

হিউম্যান মিল্ক ফর্টিফায়ার বা বলবর্ধক কী?

হিউম্যান মিল্ক ফর্টিফায়ার বা বলবর্ধক মূলত গরুর দুধ থেকে তৈরি মাণিজ্যিক ভাবে উৎপন্ন পরিপূরক খাদ্য, যা স্তন্যদুগ্ধে মিশিয়ে শিশুকে খাওয়ানো হয়। নানা রকমের ও নানা উপাদানের বলবর্ধক বাজারে পাওয়া যায়। তবে সমস্ত বলবর্ধকের সাধারণ ও প্রধান উপাদান হল প্রোটিন ও মিনারেল।

মাতৃদুগ্ধের বলবর্ধন করার প্রয়োজন আছে, কারণ মাতৃদুগ্ধে যে পরিমাণ প্রোটিন ও মিনারেল থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় এই উপাদানগুলি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে থাকা অপরিণত শিশুদের প্রয়োজন। তাছাড়া এই বলবর্ধকগুলিতে বিভিন্ন পরিমাণে ভিটামিন, ইলেক্‌ট্রোলাইট এবং অতিরিক্ত ক্যালোরিও মজুত থাকে।

নানা গবেষণায় প্রকাশ, বলবর্ধকের ব্যবহারে শিশুর ওজন ও উচ্চতায় স্বল্পমেয়াদী ভিত্তিতে উন্নতি আনা সম্ভব। আরেকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে বলবর্ধিত দুধ খাওয়ানো হলে শিশুর হাড় মজবুত ও লম্বা হয়। এই বৃদ্ধি পরবর্তীতে শিশুর উচ্চতা, ওজন ও মাথার আয়তনের বাড়বৃদ্ধিতে গতি আনে।

বলবর্ধিত দুধ ব্যবহারের নিয়মকানুন

যে সব শিশুর ওজন ২ কেজির কম হয় তাদের ক্ষেত্রেই বলবর্ধিত দুধের ব্যবহার সুপারিশ করা হয়। ২ থেকে আড়াই কেজি ওজনের সদ্যোজাতদের জন্যও বলবর্ধিত দুধ উপকারী, বিশেষত তাদের যদি বৃদ্ধির হার বা দিনপ্রতি দুধ খাওয়ার পরিমাণ কমছে বলে দেখা যায়।

শিশু যত দিন না দিনে অন্তত ২৫ মিলিলিটার করে দুধ খেতে পারছে ততদিন পর্যন্ত বলবর্ধিত দুধ শুরু করা উচিত নয়। জন্মের পর থেকেই যদি শিশু ২৫ মিলিলিটারের বেশি দুধ খেতে থাকে, তাহলেও অন্তত ৪ দিন বয়স হওয়ার আগে শুরু করবেন না।

গুরুতর অসুস্থ শিশুদের অনেক ক্ষেত্রেই মুখ ছাড়া অন্যান্য উপায়ে খাওয়ানোর প্রয়োজন হয়। মুখ দিয়ে খাওয়ানো বন্ধ করার আগে যে শিশুরা বলবর্ধক-যুক্ত মাতৃদুগ্ধ খাচ্ছিল, তাদের বলবর্ধকের পরিমাণ প্রথমে একই রাখা উচিত। শিশুদের সাধারণতঃ প্রতি আউন্সে ২৪ কিলোক্যালোরি হিসেবে বলবর্ধিত দুধ দেওয়া উচিত।

শিশুকে খাওয়ানোর আগে, প্রথমে দুধের বোতল ও নিজের হাত খুব ভালো করে ধুয়ে নিন। বুকের দুধ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বা তার চেয়ে কিঞ্চিত বেশি রাখুন। এক কাপ দুধে এক টেবিল চামচ ফর্মুলা মেশান। ভালো করে মেশান, যাতে কোনও ডেলা না থাকে। বোতল আলতো করে ঝাঁকিয়ে নিন, এবং গরম জলে রেখে গরম করুন। মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করবেন না। খাওয়ানোর আগে দুধের তাপমাত্রা সবসময় পরীক্ষা করে নেবেন। খাওয়ানোর পর বোতলে কিছু বাকি থেকে গেলে ফেলে দেবেন, ফিরে ব্যবহার করবেন না।

শিশুর শরীরে তরলের প্রবেশ যদি নিয়ন্ত্রণে রাখার দরকার থাকে, একমাত্র তখনই ফর্মুলা ঘন অবস্থায় দেওয়া যাবে। শিশু যদি হাড়ের ক্ষয়জনিত সমস্যা নিয়ে জন্মায় তা হলেও দেওয়া যেতে পারে, যেহেতু এই ক্ষেত্রে হাড়ের স্বাস্থ্য ফেরাতে প্রচুর পরিমাণে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম ও ফসফেট দরকার হয়। শিশুর ওজন যদি প্রত্যাশামত না বাড়ে তাহলে প্রোটিন পরিপূরক দেওয়া যেতে পারে।

বলবর্ধিত দুধ ব্যবহারের ঝুঁকি

এই বলবর্ধকগুলি তৈরি হয় গরুর দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য থেকে, যা ফুসফুও, কান ও পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় বলে গবেষণায় প্রকাশ। এই সংক্রমণগুলি প্রাণঘাতী আকারও ধারণ করতে পারে, যেমনটা নেক্রোটাইজিং এন্টেরোকোলাইটিস-এর ক্ষেত্রে হয়।

কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে বলবর্ধক গ্রহণ করলে পরে আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই গবেষণাগুলি বলবর্ধক ব্যবহারের সঙ্গে শিশুমৃত্যুর সম্ভাবনার যোগও খুঁজে পেয়েছে। এই গবেষণাগুলির বক্তব্য, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে ওজন বৃদ্ধির গতি ধীর হলেও বৌদ্ধিক বিকাশ হয় বলবর্ধক ব্যবহার করলে যা হয় তার তুলনায় বেশি।

তাছাড়া, শিশুর আহারে আলাদা করে দুধ বলবর্ধক যোগ করলে তাতে দেহে অতিরিক্ত মিনারেল জমে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। ভিটামিন-মিনারেলের খামতি খুবই বিপজ্জনক সন্দেহ নেই, কিন্তু তাদের বাড়াবাড়িও কিন্তু একই রকম ক্ষতিকর। এতে শিশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

এই গবেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র বুকের দুধ খাইয়ে অপরিণত শিশুর যে ধীরগতিতে বৃদ্ধি হয়, তা আসলে শিশুর পরবর্তী জীবনে স্থূলতা, মেলিটাস ডায়াবেটিস, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, এমনকি একাধিক ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমিয়ে আনে।

হাড়ের স্বাস্থ্য ফেরানোর ক্ষেত্রে বলবর্ধকগুলির ভূমিকা খতিয়ে দেখে তাঁরা বলছেন, এগুলি একেবারেই স্বল্পমেয়াদী সমাধান। হাড়ের স্বাস্থ্য ও সঠিক বিকাশের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান চাইলে অমিশ্রিত মায়ের বুকের দুধই শ্রেয়তর।

উপসংহার

স্তন্যদুগ্ধে বলবর্ধক ব্যবহারের কিছু সুবিধা আছে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দুধ ব্যবহারে ঝুঁকির পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে এর সুবিধার তুলনায় অনেকটা বেশি। কাজেই, অমিশ্রিত বুকের দুধে অপরিণত শিশুর বৃদ্ধির হার কিছুটা কম হলেও, শিশুর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী উপকারের জন্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন পূষ্টির উৎস একমাত্র এইটিই।