হাইপ্রীমেসিস গ্রাভিডরুম ডায়েট

হাইপ্রীমেসিস গ্রাভিডরুম ডায়েট

 

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি বা হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামএর ডায়েট

বমি বমি ভাব এবং বমি ভারতীয় মায়েদের একটি সাধারণ সমস্যা এবং এটি ৫০% গর্ভবতী মহিলাদের প্রভাবিত করে। এটি হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ঘটে বলে মনে করা হয়, এবং আশার কথা হল সাধারণত ১৪-২০ সপ্তাহে উন্নতি ঘটে। যাইহোক ১-৩% গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে, এই বমি বমি ভাব এবং বমি খুব গুরুতর হয় এবং দুর্বল করে ফেলে এবং হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম (এইচজি) নির্ণয় করা হয়।

এ অবস্থা গুরুতর বমি বমি ভাব, বমি, ওজন হ্রাস, এবং ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। সামান্য ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকাগত পরিবর্তন, বিশ্রাম এবং এন্টাসিড দিয়ে চিকিত্সা করা হয়। আরও গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হয় যাতে মা শিরা/ইন্ট্রাভেনাস লাইনের (IV) মাধ্যমে তরল এবং পুষ্টি পেতে পারেন।

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম কি?

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম হল গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব এবং বমির সবচেয়ে গুরুতর রূপ এবং ৩% গর্ভধারণের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এইচ জি’র উপসর্গগুলি সাধারণত গর্ভাবস্থার ৪-৬ সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশিত হয় এবং ৯-১৩ সপ্তাহের মধ্যে উচ্চতর হতে পারে। বেশিরভাগ মহিলাই ১৪-২০ সপ্তাহের মধ্যে কিছুটা পরিত্রাণ পান, যদিও ২০% পর্যন্ত মহিলাদের যত্ন নিতে হতে পারে।

এই অবস্থা নির্ণীত হয় যখন একজন মহিলা তার গর্ভাবস্থায় ওজনের ৫% হারিয়ে ফেলেন এবং জলশূন্যতাজনিত অন্যান্য সমস্যা থাকে (শরীরে তরল কমে যাওয়া); হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম’এর কোনও জ্ঞাত প্রতিরোধ নেই।

এইচ জি’র কারণ স্পষ্ট নয়, তবে গর্ভাবস্থার হরমোনের পরিবর্তন একটি ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়। সামাজিক বা মনস্তত্ত্বিক সমস্যা গর্ভাবস্থার এই ব্যাধির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এবং বিরলক্ষেত্রে গুরুতর বা ক্রমাগত বমি ও বমি বমি ভাব বা গর্ভাবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনও স্বাস্থ্যগত অবস্থা যেমন থাইরয়েড বা লিভারের রোগের কারণে হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় গুরুতর বমি বমি ভাব এবং বমির ঝুঁকিতে কে আছেন?

আপনার খুব সম্ভবত হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম হতে পারে যদিঃ

  • আপনি যমজ বা ত্রয়ী আশা করছেন
  • আপনি ভ্রমণ অসুস্থতা বা মাইগ্রেন প্রবণ হয়ে থাকেন।
  • আপনার আগের থেকেই লিভারের রোগ থাকে
  • আপনার ট্রফোব্লাস্টিক রোগ, হাইপারথাইরয়েডিজম বা গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস থাকে
  • আপনি অধিক ওজনের হয়ে থাকেন
  • আপনার পরিবারের কারও হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের ইতিহাস থাকে
  • আপনার আগের গর্ভাবস্থায় হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম হয়ে থাকে

গর্ভাবস্থার বমি বমি ভাব এবং বমি কি আপনার শিশুকে প্রভাবিত করতে পারে?

অত্যধিক বমি করা ক্ষতিকর কারণ এর ফলে জলশূন্যতা এবং গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি লোপ পায়। গর্ভাবস্থায় যদি আপনার ওজন কমে যায় তবে জন্মের সময় আপনার বাচ্চা গড়ের চেয়ে ছোট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এটা অসম্ভাব্য যে আপনার শিশু এই ভাবে প্রভাবিত হবে।

এই অবস্থা অস্থায়ী, কিন্তু এটি শারীরিকভাবে ক্ষয়কারক এবং মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন জলশূন্যতা, খাদ্যনালীতে জল, কিডনি সমস্যা, রক্ত জমাটবাধা, জন্মকালীন কম ওজন এবং এমনকি গর্ভপাত হতে পারে।

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের চিহ্ন ও উপসর্গগুলি কি কি?

  • গুরুতর বমি বমি ভাব এবং বমি
  • মূচ্র্ছা
  • জন্ডিস
  • চরম ক্লান্তি
  • নিম্ন রক্তচাপ
  • দ্রুত হৃদ কম্পন
  • ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হওয়া
  • দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বেগ / বিষণ্নতা
  • খাদ্যে অরূচি
  • প্রাক গর্ভাবস্থার ওজন ৫% বা তার বেশি হ্রাস
  • প্রস্রাবের পরিমাণ হ্রাস
  • জলশূন্যতা
  • মাথাব্যাথা
  • ধাঁধা

হাইপারমেসিস ডায়েট (শুকনো খাদ্য)

খাদ্য এবং জীবনধারার পরিবর্তন আপনাকে ভাল বোধ করতে সাহায্য করতে পারে। এই নির্দেশিকা এবং সুপারিশকৃত খাবারগুলি আপনার উপসর্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারেঃ

  • ধীরে ধীরে খান এবং খাদ্য ভালভাবে চিবিয়ে খান।
  • অল্প পরিমাণে খান এবং পান করুন
  • খাওয়ার পর অন্তত ২ ঘন্টা পর্যন্ত শোবেন না।
  • যে খাদ্যগুলি আপনি হজম করতে পারবেন বলে মনে করেন সেগুলি খান এবং প্রাকৃতিক ও অপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য পছন্দ করুন।
  • খাবারের মাঝে তরল পানীয় পান করুন এবং ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন
  • একই সময়ে খেলে এবং পান করলে যদি বমি বমি লাগে তবে খাবেন না।
  • রান্নার সময় তীব্র গন্ধ থেকে পরিত্রাণ পেতে জানালা খুলে রাখুন বা এক্সস্ট ফ্যান ব্যবহার করুন। খাবার প্রস্তুতের সময় রান্নাঘর থেকে দূরে থাকুন।
  • ২৫০ মিলিগ্রাম (এমজি) আদা সম্পূরক গ্রহণ হাইপারমেসিস উপসর্গ কমাতে সহায়ক যা প্রমাণিত হয়েছে। আপনার চিকিত্সা পরিকল্পনায় কোন ভেষজ সম্পূরক যোগ করার আগে সর্বদা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
  • জিঞ্জার কুকিজ, আদা-মিশ্রিত পানীয় এবং ক্যান্ডি আপনার উপসর্গগুলি প্রশমনে সাহায্য করতে পারে।
  • খাদ্য হতে সর্বোচ্চ পুষ্টি পেতে ও হজমের গতি বাড়াতে হজমে সহায়ক এনজাইম গ্রহণ বিবেচনা করতে পারেন।
  • সহ্য হলে তরল খাবার হজম করা সহজ এবং বমি বমি ভাব কমাতে পারে। মিল্ক শেক বা স্মুথিতে প্রোটিন গুঁড়ো যোগ করুন।
  • ঝটপট জলখাবারের জন্য খাবার ঢেকে বা কুলারের মধ্যে রাখুন। রোচক একপ্লেট স্ন্যাকস্‌ তৈরির চেষ্টা করুন যাতে ছোট করে কাটা ফল, পনির, ক্র্যাকারস, গাজর ইত্যাদি থাকে এবং এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটু একটু করে খান।
  • ভিটামিন বি৬ আলাদাভাবে অথবা কোন কোন ঔষধের সাথে মিলিয়ে খেলে উপসর্গগুলি হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। বিকল্পগুলির ব্যাপারে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

ভিটামিনের এই উৎসগুলি স্বাভাবিক ভারতীয় খাবারে পাওয়া যায়, তাই স্থানীয় বাজারে এগুলো পেতে পারেন!

ভিটামিন বি৬ এর সর্বোত্তম উৎসঃ

  • বাদামী চাল
  • পুরো আটার রুটি
  • মাছ এবং হাঁস-মুরগীর মাংস
  • ফোর্টিফাইড ব্রেকফাস্ট শস্য
  • বাদাম
  • সবুজ শাক সবজি

স্বাস্থ্যসম্মত স্বাস্থ্যকর রুপে খাওয়ার চেষ্টা করুন এবং উচ্চ আমিষ এবং উচ্চ ক্যালোরির খাদ্যের প্রয়োজন হতে পারে যদি বমি বমিভাব এবং বমির কারণে আপনার ওজন বাড়াতে সমস্যা হয়।

আপনার কি কি এড়িয়ে চলা উচিত?

  • প্রচুর মশলা ও উচ্চ চর্বিযুক্ত খাদ্য যেমন ভাজা খাবার, মেক্সিকান খাবার ইত্যাদি।
  • তীব্র গন্ধ আছে এমন সব খাদ্য। ঠান্ডা খাবার ভাল সহ্য হতে পারে, কারণ তাতে কম গন্ধ আছে। উদাহরণস্বরূপ, ভাঁজা ডিম বা ওমলেট থেকে আপনার বমি বমিভাব হতে পারে কিন্তু ঠান্ডা, খুব সেদ্ধ ডিমে নাও হতে পারে।
  • গরম এবং ঠান্ডা খাবার একসাথে মেশানো।
  • যতটা সম্ভব, হাইড্রোজেনেটেড তেল, কীটনাশক, নাইট্র্রেট (স্মোকড/ধূমায়িত মাংস, লাঞ্চ মিট, হট ডগ), বৃদ্ধিকারী হরমোন (ডেয়ারী ও পোলট্রি), চিনির পরিপূরক এবং খাদ্যের রঙ বা সংযোজক এড়িয়ে চলুন।
  • চর্বিযুক্ত বা ভাজা খাবার এড়িয়ে চলুন যেহেতু এগুলো লিভার এবং পিত্তথলির ক্ষতি করে।
  • যেসব খাদ্য আপনার বমি বমি ভাব এবং বমির উদ্রেক করে, এবং সেগুলিকে আপনার কাছ থেকে দূরে রাখতে বলুন।

গর্ভাবস্থার বমি বমি ভাব এবং বমির চিকিত্সা কি?

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম সাধারণত প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকে এবং বিলম্ব ছাড়াই চিকিত্সা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি বমি বমি ভাব এবং বমি এমন মারাত্মক হয় যাতে আপনি এবং আপনার শিশুকে বিপদে ফেলতে পারে তবে ডাক্তার আপনাকে বমি বমিভাব বিরোধী ওষুধ লিখে দেবেন।

যদি আপনার অবস্থা খুব গুরুতর হয়, তাহলে আপনাকে হাসপাতালের ভর্তি করা হবে এবং আপনাকে শিরার/ইন্ট্রাভেনাস (IV) মাধ্যমে তরল এবং পুষ্টি দেয়ার প্রয়োজন হবে এবং বমি বমিভাব ও রিফ্লাক্স বিরোধী ঔষধ খেতে হবে। ঔষধ সেবনের ব্যাপারে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি ঝুঁকি ও উপকারিতা বিবেচনা করবেন কারণ কিছু ঔষধ আপনার উপর অথবা আপনার শিশুর বিকাশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

হাসপাতালে থাকাকালীন, আপনার রক্ত উপাদানগুলির গণনার উপর নজর রাখতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী আপনার রক্তের একাধিক নমুনা গ্রহণ করবে। এই পরীক্ষাগুলি আপনার  জলশূন্যতা এবং অপুষ্টির লক্ষণগুলি সনাক্ত করে যেমন প্রস্রাবে বিষাক্ত এসিডিক রাসায়নিক যা কিটোন নামে পরিচিত। আপনার গর্ভে একাধিক বাচ্চা আছে কিনা বা অন্য কোন অবস্থা যা গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করতে আপনার আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করা হতে পারে।

আপনি কখন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর শরণাপন্ন হবেন?

মনে রাখবেন এইচজি বহু স্বাস্থ্যগত সমস্যা ঘটাতে পারে এবং এমনকি আপনাকে হাসপাতালে পর্যন্ত নিতে পারে, তাই আপনার ডাক্তারের শরণাপন্ন হন যদিঃ

  • আপনি রক্ত বমি করেন
  • আপনার গুরুতর বমি বমি ভাব এবং বমি থাকে
  • বমি বমি ভাব বা বমি গুরুতর হয়
  • দাঁড়ালে মাথা চক্কর দেয় বা আপনি দুর্বল বোধ করেন
  • আপনার হৃদ কম্পন অতি দ্রুত হয়
  • আপনি শুধুমাত্র অল্প প্রস্রাব করেন বা এটি গাঢ় রঙের হয়
  • আপনি তরল ধরে রাখতে পারেন না
  • আপনার গর্ভাবস্থা, ঔষধ বা এই ডায়েট সম্পর্কে কোন প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে।

সকালের অসুস্থতা প্রতিরোধে কোন প্রমাণিত উপায় নেই এবং এটি বিশেষ করে প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় গর্ভবতী নারীদের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করে। সকালের অসুস্থতার গুরুতর রূপকে বলা হয় হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম এবং সাধারণত এর জন্য চিকিত্সা প্রয়োজন হয় না, যদিও বিভিন্ন ঘরোয়া প্রতিকার যেমন সারা দিন ধরে জলখাবার এবং আদা-মিশ্রিত পানীয় চুমুকে প্রায়ই বমি বমি ভাব উপশমে সাহায্য করে।