ডায়াবেটিস সঙ্গে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য খাবার পরিকল্পনা

ডায়াবেটিস সঙ্গে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য খাবার পরিকল্পনা

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস কি?

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস একটি স্বাস্থ্যাবস্থা যা গর্ভকাল (গর্ভাবস্থা) শব্দ থেকে এসেছে এটি গর্ভাবস্থার শেষ দিকে যখন বাচ্চার সম্পূর্ণ গঠন হয়ে যায় তখন মায়ের উপর প্রভাব ফেলে এবং রক্তে গ্লুকোজের (চিনি) উচ্চ মাত্রার কারণে ঘটে থাকে

ইনসুলিন, অগ্ন্যাশয়ে উত্পন্ন একটি হরমোন যা রক্তে গ্লুকোজকে (চিনি) শক্তিতে রুপান্তর করে থাকে যাতে আমাদের শরীরের কোষগুলি ব্যবহার করতে পারে, তবে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিন এভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয় এবং এভাবে রক্তে গ্লুকোজের (চিনি) মাত্রা বেড়ে যায়

কারা ঝুঁকিতে আছেন?

গর্ভবতী মহিলাদের প্রায় ১০% গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বিকাশ লাভ করে ভারতীয় জনসংখ্যার ক্ষেত্রে, ডায়াবেটিস একটি প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা, যে কোনও সময়ের বিচারে  কমপক্ষে মিলিয়ন সন্তান সম্ভবা মায়েরা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে অনুমান করা হয় যদিও এর সঠিক কারণ অজানা কিন্তু কিছু কিছু প্রভাবক আছে যেমন প্রাক-ডায়াবেটিস, পারিবারে কারো আগে থেকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে, অথবা উচ্চ রক্তচাপে ভোগা মহিলারা সাধারণত এর ঝুঁকিতে আছেন

এটি কি ভ্রূণকে প্রভাবিত করে?

যদি চিকিত্সা না করা হয়, তবে এটি মায়ের গর্ভের ক্রমবর্ধমান শিশুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে মায়ের রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ গর্ভনাড়ি দিয়ে শিশুর শরীরে ঢুকে এবং তার রক্তস্রোতে মিশে যেতে পারে রক্তে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজের উপস্থিতি শিশুর অগ্ন্যাশয়কে ইনসুলিন উৎপাদনে বাধ্য করে সেগুলি ভাঙতে এটি ফিটাল ম্যাক্রোসোমিয়া ঘটায়, যেমন শিশুটি গড় ওজনের চেয়ে ভারী, পাউন্ডের বেশী ওজনের হয়

ফিটাল ম্যাক্রোসোমিয়া প্রসবের সময় বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করে, যেমন যোনিপথে বাচ্চা প্রসব কঠিন হয় ও বাচ্চার আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া শিশুর স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিসের কিভাবে যত্ন নেয়া যায়?

সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল স্বাস্থ্যকর খাদ্য বজায় রাখা পর্যাপ্ত যত্ন নেওয়া হলে, আপনি এবং আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের যেকোন ঝুঁকি দূর করতে পারেন

কিভাবে শর্করা ডায়াবেটিসকে প্রভাবিত করে তা জানুন!

আপনি অবশ্যই কার্বোহাইড্রেট বা কার্বস সম্পর্কে জেনেছেন, যেটি শর্করা ছাড়া কিছুই নয় এটি দু ধরনের হয়, সরল কার্বস এবং জটিল কার্বস

সরল কার্বোহাইড্রেট, যেটি সরল শর্করা, এটি শরীরে দ্রুত ভেঙ্গে যায়। সরল শর্করার তিন ধরনের, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ এবং গ্যালাক্টোজ শরীরে গ্লুকোজ ব্যবহারের জন্য ইনসুলিন প্রয়োজন হয় এবং ডায়াবেটিক রোগীর ইনসুলিনের দুর্বলতার কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি দেখা যায়, যেটাকে আমরা বলি রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা গ্লুকোজ অধিক পরিমানে আছে এমন সব খাবার এড়িয়ে চলা ভাল

শরীরে ফ্রুক্টোজ ব্যবহারের জন্য ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় না অতএব, ফ্রুক্টোজ রক্ত গ্লুকোজ মাত্রা বাড়ায় না এবং এটি খাওয়া যেতে পারে

দুগ্ধজাত পণ্যে অন্যান্য সাধারণ শর্করার সাথে গ্যালাক্টোজ  উপস্থিত থাকে উদাহরণস্বরূপ, দুধে ল্যাকটোজ থাকে যা ভেঙ্গে  গ্যালাক্টোজ এবং গ্লুকোজের হয়তাই গ্যালাক্টোজ রক্তের শর্করার মাত্রা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে না তবে এর উপজাত গ্লুকোজ ডায়াবেটিক রোগীদের ইনসুলিনের দুর্বলতার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে

জটিল কার্বোহাইড্রেট বা জটিল শর্করাগুলি ভাঙ্গতে বেশি সময় লাগে জটিল শর্করা বলতে প্রাকৃতিক এবং পরিশোধিত সমস্ত শ্বেতসারবহুল খাবার বোঝায়, কিন্তু যখন একজন খাদ্যনির্বাচনবিদ বা পুষ্টিবিদ জটিল শর্করা উল্লেখ করেন তখন তিনি পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে পুরো শস্যের খাবার এবং শ্বেতসারবহুল খাবার বোঝান পুরো শস্যের খাবার অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধীরে প্রভাবিত করে, কিন্তু উচ্চ মাত্রার কার্বোহাইড্রেট তখনও রক্ত শর্করার মাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িয়ে দিতে পারে

চিনির বিকল্প সম্পূরকগুলিও যথেষ্ট চিন্তার বিষয়, এগুলি আপনার ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে চমৎকারভাবে বিজ্ঞাপিত হচ্ছে, কিন্তু গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সেগুলির ব্যবহার কতটা নিরাপদ?

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলাদের জন্য খাবার পরিকল্পনাঃ

একটি সুস্থ জীবনযাপন পদ্ধতি মেনে চলুন এবং না খেয়ে থাকবেন না এর পরিবর্তে, আপনি খাবারের মধ্যে ক্যালোরি ভাগ করে নিতে পারেন খাবারের মধ্যে অনুপাতগুলি সীমিত করুন; দুই বা তিনটি স্ন্যাকসে্‌র সাথে দিনে তিন বেলা খাবার খান দিনে যখন আপনার চিনির মাত্রা অনেক কমে যায় তখন স্বাস্থ্যকর নাস্তা খাওয়ার উপর অধিক মনোযোগ দিন!

যেসব খাদ্য দ্রব্যকেনা বলবেন

খাদ্য এবং পানীয় যেগুলি এড়িয়ে চলতে হবে তা হল পরিশোধিত শর্করা এবংপরিশোধিত শ্বেতসার যেসব খাদ্য এবং পানীয় থেকে আপনার দূরে থাকা উচিৎ তার মধ্যে ফলের রস, মধু, দুধ, স্বাদযুক্ত চা, সোডা, ডেজার্ট, প্রক্রিয়াজাত শস্য যেমন সাদা চাল বা সাদা ময়দা, সামান্য দানাযুক্ত শস্য, সাদা রুটি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সাদা আটা দিয়ে ভাজা টর্টিলা ইত্যাদি

যদিও গর্ভাবস্থায়বিজ্ঞাপনেদেখানো ভাল চিনির সাপ্লিমেন্টস বা  মিষ্টি করায় ব্যবহৃত পুষ্টিকর পদার্থ সীমিত আকারে গ্রহণ করতে বাঁধা নেই কিন্তু গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে এগুলি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিসে ফল খাওয়া ভাল না খারাপ?  

বেশিরভাগ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য ফল প্রয়োজনীয় সরল ফ্রুক্টোজ সরবরাহ করে মিষ্টি ইত্যাদিতে কৃত্রিম উত্স থেকে উদ্ভূত শর্করার মত ফ্রুক্টোজ শরীর দ্বারা শোষিত হতে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় না রক্তে শর্করার পরিমান হঠাৎ না বাড়িয়ে ফ্রুক্টোজ তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী শক্তি প্রদান করে তাই ডায়াবেটিক রোগীরা ফল খেতে পারেন প্রকৃতপক্ষে, ফল খাওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য চিনিযুক্ত খাবারের প্রতি আসক্তিও কমে যায় এছাড়াও ফল পুষ্টিসমুহ (এনজাইম, ভিটামিন, খনিজ), জল এবং ফাইবারের বড় উৎস যখন আপনি ভাল অনুভব করছেন না, তখন ফল খেতে পারেন

অন্যান্য উপকারী খাবার কি কি?

যেসব খাবারে উচ্চমাত্রায় আঁশ/ফাইবার এবং জটিল চিনি রয়েছে সেগুলো খেতে পরামর্শ দেয়া হয় যেমন সবুজ শাঁকসবজি, পুরো শস্যের রুটি এবং শস্যদানা, এবং অঙ্কুরিত ছোলা, মটরশুটি এবং অন্যান্য কলাই ডাল। এটি শুধু আপনার চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রিতই রাখে না বরং কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেও মুক্তি দেয় যেটি সন্তান সম্ভবা মায়েদের একটি সাধারণ অভিযোগ।

প্রোটিন খাওয়ার পরিমান বৃদ্ধি করুন: বেশিরভাগ প্রোটিনের উত্সগুলিতে কার্বোহাইড্রেট থাকে না এবং আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াবে না। আপনার খাদ্য তালিকায় ডিম এবং ডিমের সাদা অংশ, পনির, বাদাম, বেক/ভাপে সেদ্ধ করা মাছ এবং চামড়া ছাড়া মুরগীর বুকের মাংস যোগ করতে পারেন।

সম্পৃক্ত চর্বির পরিবর্তে মনো-অসম্পৃক্ত চর্বি এবং ওমেগা-৩ চর্বি আপনার খাদ্য তালিকায় থাকতে হবে। বাদাম খাবেন, আভোকাডো আপনার খাদ্যে যুক্ত করুন এবং বিশেষ করে রান্নার জন্য অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন। আখরোট, শণ বীজ এবং ডিমও ওমেগা-৩ এর সমৃদ্ধ উৎস। আপনি ওমেগা-৩ পুষ্টির বিকল্প হিসাবে কড মাছের যকৃতের তেল সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করতে পারেন।

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস কি বাচ্চা হওয়ার পর ঠিক যায়?

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস বাচ্চা হওয়ার পর ঠিক হয়ে যাওয়ার ভাল সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে যদি আপনি গর্ভাবস্থায় নিজের ভাল যত্ন নিয়ে থাকেন। কখনও কখনও, শুধুমাত্র স্বাস্থ্যকর খাওয়া আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য যথেষ্ট নয়; ডাক্তাররা আপনার রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রনের জন্য ইনসুলিন দিতে পারেন। ইনসুলিন গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করা নিরাপদ, শুধুমাত্র যদি ডাক্তার এটি আপনাকে নিতে পরামর্শ দেন তবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিপরীত ওষুধ ব্যবহার করা ঠিক নয়।

উপরন্তু, বয়স বাড়লে নারীরা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাই নিরাপদ থাকতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি মেনে চলা এবং আপনার সন্তানের জন্মের ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ও প্রতি ১ থেকে ৩ বছর সময়ে আপনার সুগার লেভেল পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্ত সন্তান সম্ভবা মায়েদের জন্য পরামর্শঃ

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্ত সন্তান সম্ভবা মায়েদের জন্য তাদের চিকিত্সক বা ডাক্তাররা প্রতিদিন তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন; উপোসকালীন রক্তের শর্করার মাত্রা ৯৫ মিলিগ্রাম/ডিএল থেকে কম হওয়া উচিত নয় এবং খাওয়ার এক ঘণ্টা পর ১৪০ মিলিগ্রাম/ডিএল এর বেশি হবে না। প্রাকৃতিক উত্স হতে প্রাপ্ত চিনিতে নির্ভর করা উপকারী যেমন, ফল, মিষ্টি কুমড়ো এবং অন্যান্য লাউ জাতীয় শাকসবজি, মূল বিশিষ্ট সবজি যেমন আলু, গাজর এবং বিট। মনে রাখবেন এর মানে এই নয় যে চিনি সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে হবে, বরং এটা চিনির সঠিক উৎস নির্বাচন করার বিষয় যাতে শরীর সহজেই পরিপাক করতে পারে কোন ধরনের সম্পূরক ছাড়াই।