বমি বমি ভাব, বমি এবং গর্ভাবস্থায় পুষ্টি

বমি বমি ভাব, বমি এবং গর্ভাবস্থায় পুষ্টি

 

গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনের একটি সুন্দর কিন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়। এসময় তিনি পরিবার এবং বন্ধুদের ভালবাসা ও চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হন। একজন ভারতীয় মা হিসাবে বলতে পারি, আমাকে অসংখ্যবার, গর্ভাবস্থায় কি করতে হবে এবং কি করা যাবেনা এ ব্যাপারে জানা ও অজানা উত্স থেকে প্রাপ্ত উপদেশ দেওয়া হয়েছে, যে সময় আগে থেকেই বাড়তে থাকা উদ্বেগের সাথে এগুলি যোগ হতে থাকে। অতএব, এটিকে সর্বদা উচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে গর্ভাবস্থায় শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলি সম্পর্কে প্রত্যেক মাকে সচেতন থাকতে হবে এবং সেগুলিকে সাদরে গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি ‘একজন সুখী মা মানেই – একটি হাসিখুশি শিশু।’

গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ

গর্ভাবস্থার প্রথমদিকে বেশিরভাগ মহিলারাই প্রথম এবং প্রধান যে পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেন তা হল বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া। যেটাকে ‘প্রাতঃকালীন অসুস্থতা’ বলা হয়ে থাকে, বমি বমি ভাব বা বমি গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে একটি বলে বিবেচিত এবং এটি শুধু সকালে নয় দিনের যেকোনো সময়ে হতে পারে।

যদিও বমি বমি ভাবটি বেশ অস্বস্তিদায়ক, এটির ভাল দিক হল এটি ‘ক্ষতিকারক নয়’। এটি সুস্থ গর্ভাবস্থার একটি লক্ষণ বিশেষ। এটি খাবারের বিষাক্ততা থেকে মা ও শিশুকে রক্ষা করার জন্য মায়ের শরীরের একটি প্রাকৃতিক উপায় মাত্র।

বমি বমি ভাবের কারণ

গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাবের কারণ যথাযথভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায় না কিন্তু এটা বোঝা যায় যে এটি গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ঘটে।

গর্ভাবস্থায় খাবারের জন্যও বমি বমি ভাব হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মিষ্টান্ন, ক্যাফিন, মাংস, দুধ, ডিম সহজেই বমি বমি ভাবের উদ্রেক করতে পারে, যেখানে ডাল এবং শস্য পেটের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়। কিছু খাবারের গন্ধ থেকেও বমি বমি ভাব সৃষ্টি হতে পারে।

এটা জেনে রাখা ভাল যে বমি বমি ভাবের কারণগুলি নির্দিষ্ট করণের কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান।

বমি এবং বমি বমি ভাব কতক্ষণ স্থায়ী হয়?

প্রায় ৭০ ভাগ গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব এবং বমি হয়ে থাকে। গর্ভধারণের ৪-৮ সপ্তাহের মধ্যে শুরু এবং ৩-৪ মাস পর্যন্ত বমি বা বমি বমি ভাব হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার পুরোটা সময় জুড়ে বমি হতে পারে। দিনে বার কয়েক বমি করা একজন গর্ভবতী মহিলার জন্য স্বাভাবিক। এটাও মনে রাখতে হবে যে সব গর্ভবতী মহিলারাই বমি এবং বমি বমি ভাব অনুভব করবেন এমনটি নয়।

কখন ডাক্তার দেখাতে হবে

বিরল ক্ষেত্রে, মায়েরা অবিরাম বমি এবং গুরুতর বমি বমি ভাব অনুভব করেন যা হাইপ্রীমেসিস  গ্রাভিডারামের দিকে নিয়ে যায় – এটি এমন একটি অবস্থা যাতে তরল এবং ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটায়, কেটোনিয়ারিয়া, পুষ্টির অভাব এবং ওজন কমে যায়। এই পর্যায়ে মা খাওয়া খাবার অথবা তরল ধরে রাখতে সক্ষম হয় না। এইরকম অবস্থায় দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া খুবই জরুরী। সঠিকভাবে চিকিত্সা না করা হলে এর ফলে স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা, লিভারের অকার্যকারিতা এবং কিডনির ক্ষতি হতে পারে।

বমি বমি ভাব এবং বমি কিভাবে মোকাবেলা করবেন

  • সকাল বেলার বমি বমি ভাবের জন্য হালকা জলখাবার দিয়ে দিন শুরু করা ভাল। বিছানা ছাড়ার আগে একটি বা দুইটি নোনতা বিস্কুট, শস্য অথবা একটি টোষ্ট বমনেচ্ছা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
  • শোবার আগে পাতলা মাংস বা উচ্চ প্রোটিন জলখাবার খাওয়া আরেকটি ভাল বিকল্প।
  • পুরো এক গ্লাস দুধ বা চা দিয়ে দিন শুরু থেকে বিরত থাকুন। সারা দিন ধরে অল্প অল্প করে তরল (ফলের রস, দুধ, পানি) চুমুক দেয়া ভালো। এক সাথে খুব বেশি তরল পান করলে অস্বস্তি বোধ এবং এর ফলে বমি হতে পারে।
  • স্ন্যাক্‌স/জলখাবার এবং খাবার ভাল হজম হয় যখন কম পরিমাণে ২ – ৩ ঘন্টা অন্তর খাওয়া হয়।
  • খুব ঝাঁজাল গন্ধযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন
  • হাতে লেবু রাখুন। তাজা লেবুর গন্ধ বা লেবু খেলে বমি বন্ধ হতে পারে।
  • যথেষ্ট বিশ্রাম নিন।

গর্ভাবস্থায় ডায়েট/খাবার দাবার

পুরো গর্ভকালীন সময়ে একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েট বজায় রাখা অপরিহার্য। ডাক্তারের নির্দেশিত লৌহ ও ফোলিক অ্যাসিড সম্পূরক ছাড়াও, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আপনার জন্য ভাল।

যথেষ্ট পরিমাণে তরল পান করুন। দুধ, দই, ছানা পনির বা পনির ভিটামিন বি ১২ এর অপরিহার্য উৎস। কেউ কাজু বাদাম ও আখরোটের মতো স্বাস্থ্যকর বাদাম দিয়েও স্ন্যাক্‌স বানাতে পারেন। একজন ভারতীয় হিসাবে আপনার খাদ্যে বিভিন্ন রকম ডাল অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। ফল ও সবজি মিনারেল এবং ভিটামিন ছাড়াও যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবার/আঁশ সরবরাহ করে। আপনি যদি নিরামিষভোজী না হন তবে আপনার খাদ্য তালিকায় স্যুপ এবং মাংস অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করুন। বিশেষভাবে মাছ খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। যতটা সম্ভব বাসায় রান্না ও তাজা খাবার খাওয়ার এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। যেহেতু প্রত্যেকের পছন্দ আলাদা তাই এমন একটি খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় যা আপনার শরীরের জন্য উপযুক্ত। সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি হল অল্প এবং যতটা সম্ভব ঘনঘন খান।

পরিশেষে,  প্রত্যেককে তার শরীরের পরিবর্তনগুলি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং যেকোন অস্বাভাবিকতার লক্ষণ দেখা দিলে তা সমাধান করাও আবশ্যক। যে জিনিষগুলি আপনাকে খুশি এবং স্বচ্ছন্দে রাখে তা করুন। গর্ভাবস্থাকে অসুস্থতা হিসাবে গণ্য করলে হবে না। এটি জীবনের একটি পর্যায় যা ইতিবাচক মনোভাবের সহিত শান্ত ও প্রফুল্ল চিত্তে গ্রহণ করতে হবে।