গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মত আহার কী ভাবে করবেন : ‘দু’জনের জন্য খাওয়া’ বলতে আসলে কী বোঝায়?

গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মত আহার কী ভাবে করবেন : ‘দু’জনের জন্য খাওয়া’ বলতে আসলে কী বোঝায়?

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

গর্ভবতী হলে বা সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনায় থাকলে, এত দিনে নিশ্চয় এমন বহু লেখাপত্রই আপনি দেখে ফেলেছেন যেখানে গর্ভাবস্থায় “দু’জনের জন্য খাওয়া”র পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে পরামর্শটা যুক্তিসম্মত মনে হলেও, প্রকৃত অর্থে গর্ভাবস্থায় ‘দু’জনের জন্য খাওয়া’র প্রয়োজন সত্যিই নেই।

গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি

সন্তান এবং মা উভয়ের স্বার্থেই মায়ের ওজন বৃদ্ধি হওয়া জরুরি; অবশ্যই গর্ভবতী হওয়ার আগে তাঁর যা ওজন ছিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। গর্ভাবস্থা যত এগোয়, বাড়ন্ত ভ্রূণটির পুষ্টিগুণের চাহিদাও সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর রোজকার আহারের মাধ্যমে এই পৌষ্টিক উপাদানগুলি নিয়মিত দেহে ঢোকানো না হলে, মা এবং শিশু উভয়েরই স্বাস্থ্য তথা বাড়বৃদ্ধির পক্ষে মারাত্মক সব সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হয়।

গর্ভাবস্থায় আদর্শ বর্ধিত ওজন কতটা হওয়া উচিত তা বোঝার একটা ভালো পন্থা হল গর্ভাবস্থার আগের ওজনের উপর ভিত্তি করে নিজের বিএমআই হিসেব করা এবং তারপর নিম্নোক্ত নির্দেশগুলি অনুসরণ করা।

স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন থাকলে (বিএমআই ১৮.৫-এর কম) গর্ভাবস্থায় ১৩ থেকে ১৮ কেজি ওজন বাড়ানো দরকার। একই ভাবে, গর্ভবতী হওয়ার আগের ওজন যদি বেশির দিকে থাকে (বিএমআই ২৫ থেকে ২৯-এর মধ্যে) তবে পুরো গর্ভাবস্থায় ওজন বাড়া দরকার ৭ থেকে ১১ কেজি মত। যে মহিলারা গর্ভবতী হওয়ার আগে স্থূলকায় ছিলেন (বিএমআই ৩০-এর বেশি), তাঁদের জন্য ৫ থেকে ৯ কেজি ওজন বৃদ্ধি আদর্শ। গর্ভাবস্থার আগে স্বাভাবিক ওজন ছিল যাঁদের (১৮.৫ থেকে ২৪.৯-এর মধ্যে বিএমআই), তাঁদের জন্য ১১ থেকে ১৫ কেজি ওজন বাড়ানো আদর্শ হবে।

“দু’জনের জন্য খাওয়া”র চক্করে এই নির্ধারিত সীমাগুলির চেয়ে বেশি ওজন বেড়ে গেলে তা আপনার বা আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের উপর কোনও ইতিবাচক প্রভাব তো ফেলবেই না, উলটে তা শিশুর স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। তাছাড়া, সন্তানজন্মের পর নিজের আগের চেহারায় ফিরে যাওয়াটাও অত্যন্ত কষ্টকর হবে।

গর্ভাবস্থায় “দু’জনের জন্য খাওয়া”র প্রয়োজন কী আদৌ আছে?

অনেক মেয়েই বিশ্বাস করেন যে স্বাস্থ্যবান শিশু চাইলে রোজের খাবারের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ করে দিতে হবে। এটা শুধুই মিথ, আর তাছাড়া গর্ভাবস্থায় আহার পরিকল্পনার পন্থা হিসেবে খুবই বিপজ্জনক। গর্ভাবস্থায় বেশি পৌষ্টিক উপাদান গ্রহণ করা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন স্বাস্থ্যকর গর্ভধারণের জন্য দিনপ্রতি গড়ে ৩০০ অতিরিক্ত ক্যালোরিই যথেষ্ট।

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে, রোজের আহার যদি স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর হয় তাহলে আর অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করার তেমন প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয় তিন মাস কালে রোজের আহারে অতিরিক্ত ৩৪০ ক্যালোরি যোগ করা সমীচীন হবে। তৃতীয় তিন মাস কালে প্রতি দিন গড়ে অতিরিক্ত ৪৫০ ক্যালোরি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই হিসাবটি স্বাভাবিক বিএমআই-যুক্ত মহিলাদের জন্য। কম ওজন, বেশি ওজন এবং স্থূলকায় মহিলাদের জন্য আদর্শ ওজন বজায় রাখবে (আগের পর্যায়ে যে ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে) এমন একটা দৈনন্দিন আহার পরিকল্পনা অনুসরণ করা উচিত।

স্বাস্থ্যকর গর্ভধারণের জন্য আহার পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?

“দু’জনের জন্য খাওয়া” আদর্শ নয় এটা তো বোঝা গেল। এবার দেখা যাক সুস্থ স্বাভাবিক গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পুষ্টিগুণ আপনি কী ভাবে আহরণ করতে পারেন। সত্যি বলতে, এমনকী তৃতীয় তিন মাস কালেও কয়েক গ্লাস দুধ আর ২-৩টি অতিরিক্ত রুটি খেলেই দৈনিক পুষ্টিগুণ আহরণের কাজটা হয়ে যায় (অবশ্যই যদি আপনার দৈনন্দিন আহার এমনিতেই স্বাস্থ্যকর থেকে থাকে তবেই)।

গর্ভাবস্থায় উপযুক্ত আহার পরিকল্পনার জন্য কিছু টিপস নীচে দেওয়া হল :

  • ফল, শাকসবজি এবং গোটা শস্যদানা খাওয়ার উপর জোর দিতে হবে। এইগুলি ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি এবং লোহার মত পুষ্টিপুণে ভরপুর যা সুস্থ ও নিরাপদ গর্ভধারণের জন্য আবশ্যক।
  • “দু’জনের জন্য খাওয়া”র পরিকল্পনা ছাড়ুন, কারণ দ্বিগুণ পরিমাণ ক্যালোরির প্রয়োজন আপনার সত্যিই নেই। কাজেই, বাইরের ভাজাভুজি বা জাঙ্ক ফুড খেয়ে ওজন বাড়াতে যাবেন না, কারণ এগুলির একদিকে পুষ্টিগুণও কম, আর তার সাথে সাথে ক্যালোরি, শর্করা আর অতিরিক্ত স্নেহপদার্থে ভর্তি।
  • সাধারণ রান্নার তেলের বদলে অলিভ অয়েলে রান্না করা অভ্যাস করুন, এতে স্নেহপদার্থ বা ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ কমবে। অতিরিক্ত ফ্যাট শিশুর বৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
  • প্রতিটি খাবারের পরিমাণ একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখুন, নাহলে বেশি বেশি খাওয়া হয়ে গিয়ে শরীরে ক্যালোরির পরিমাণ অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারে।
  • শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং হঠাৎ হঠাৎ খাওয়ার ইচ্ছে কমাতে সারা দিনে প্রচুর জল ও ফলের রস খান।
  • কাঁচা বা আধসেদ্ধ মাছ-মাংস খাবেন না। কাঁচা মাংসে প্রচুর পরিমাণে টক্সিন থাকে যা থেকে নানা ধরণের সংক্রমণ হতে পারে; যেমন নরোভাইরাস, ভাইব্রিয়ো, স্যালমোনেলা, লিস্টেরিয়া ইত্যাদি। বিশেষ করে লিস্টেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা গর্ভবতী মহিলাদের খুব বেশি।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সুস্থ ও স্বাভাবিক গর্ভধারণের জন্য জরুরি খাদ্যাভ্যাস সাধারণ ভাবে সুস্থ শরীরের জন্য জরুরি খাদ্যাভ্যাসের থেকে খুব একটা আলাদা কিছু নয়। গর্ভধারণের আগে, চলাকালীন এবং পরে নিজের ওজন নজরে রাখুন। গর্ভাবস্থায় আপনার আদর্শ ওজনের যথাসম্ভব কাছাকাছি ওজন রাখার চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখুন দৈনন্দিন ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ যাতে বেশি না হয়ে যায়। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বা জাঙ্ক ফুড থেকে দূরে থাকুন।

এবং অবশ্যই মনে রাখুন, “দু’জনের জন্য খাওয়া”র প্রয়োজন কিন্তু একেবারেই নেই!