রাত্রিকালীন স্তন্যদান কেন গুরুত্বপূর্ণ

রাত্রিকালীন স্তন্যদান কেন গুরুত্বপূর্ণ

 

এই নিবন্ধটি বর্তমানে IAP বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা অধীনে; এখনো সম্পাদিত এবং অনুমোদিত এবং প্রযুক্তিগত এবং ভাষা ত্রুটি থাকতে পারে। দয়া করে এখানে ক্লিক করে সংশোধন এবং অনুমোদিত ইংরেজি সংস্করণ পড়ুন।

শিশুকে সুস্থ রাখতে রাত্রিবেলা বুকের দুধ খাওয়ানোর একাধিক উপযোগিতা আছে।

শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য রাত্রিকালীন স্তন্যপান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গবেষণা বলছে, ১ থেকে ৬ মাস বয়সের শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশ-কে রাত্রিবেলা অন্তত তিন বার বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন হয়। শিশুর আহারে রুচি তথা বাড়বৃদ্ধিতে এই স্তন্যদান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। শিশু তার দিনের বরাদ্দ দুধের প্রায় ২০ শতাংশ খায় রাত্রিবেলায়।

রাত্রিবেলা দুধ খাওয়ালে আপনার শরীরে প্রোল্যাকটিন হরমোনের (যা শরীরে দুধ উৎপাদনে সাহায্য করে) ক্ষরণ বেশি হয়। কাজেই রাত্রিবেলা স্তন্যদান সার্বিক ভাবে আপনার দেহে দুধের সরবরাহও বাড়াতে সাহায্য করে। রাত্রিবেলা দুধ খাওয়ানোর কিছু উপযোগিতা নীচে বিস্তারিত বলা হল:

  • শিশুকে রাতে ঘুমোতে সাহায্য করে
    বুকের দুধে ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা থেকে মেলাটোনিন নামে একটি হরমোন তৈরি হয়। এই মেলাটোনিন শিশুর দিনরাতের শারীরিক ঘড়ি, অর্থাৎ ঘুম-খিদে ইত্যাদি ক্রিয়ার জন্য শরীরের যে নিজস্ব সময়ানুবর্তন থাকে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। কাজেই রাত্রিবেলা বুকের দুধ খেলে শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম হতে সাহায্য হয়।
  • শিশুর একমাত্র খাবার, এবং দ্রুত হজম হয়ে যায়
    বুকের দুধ দু’ঘণ্টার মধ্যে হজম হয়ে যায়, যে কারণে শিশুকে বারবার খাওয়াতে থাকতে হয়। কাজেই রাত্রিকালে বুকের দুধ খাওয়ানোটা শুধু জরুরিই নয়, একেবারে অপরিহার্য বলা চলে। তাছাড়া, যত বেশি বার দুধ খাওয়ানো হবে মায়ের দুধের জোগানও সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে।
  • স্তন্যদান গর্ভনিরোধের অন্যতম উপায়
    ল্যাকটেশনাল অ্যামেনোরিয়া মেথড বা ল্যাম সদ্য মায়েদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী একটি গর্ভনিরোধক পন্থা। জন্মের প্রথম ৬-৮ মাস শিশুকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাইয়ে রাখলে তা গর্ভনিরোধকের কাজ করে। অন্য কোনও খাবার দিয়ে শিশুর পুষ্টিসাধন না করলে বারবার বুকের দুধ খাওয়াতে থাকা অত্যন্ত জরুরি, আর তাই রাত্রিকালীন স্তন্যদানের ভূমিকাও এখানে অনস্বীকার্য।
  • মায়ের ঘুমের সময় বৃদ্ধি করে
    সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় প্রকাশ, যে মায়েরা রাত্রিবেলা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান তাঁরা, যাঁরা খাওয়ান না তাঁদের তুলনায় বেশি সময় ঘুমোন। রাত্রিবেলা দুধ খাওয়ানো স্তন্যদাত্রী মায়েদের প্রসব-পরবর্তী অবসাদ থেকে পরিত্রাণেও সাহায্য করে।
  • দুধের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে
    মায়ের শরীরে দুধের জোগান স্থিতিশীল রাখতে রাত্রিকালীন স্তন্যদান খুবই জরুরি। প্রোল্যাকটিন হরমোন ক্ষরণের কারণে এই সময়ে দুধ খাওয়ালে দুধের জোগান বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া, যে মায়েরা কর্মরতা তাঁরা রাত্রিবেলা দুধ খাইয়ে সকালে কাজে বেরোতেও পারবেন।
  • স্তন্যপান শিশুদের এস আই ডি এস বা সদ্যোজাত মৃত্যু থেকে বাঁচায়
    এ বিষয়ে কার্যকারণ সম্বন্ধ এখনো বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি বটে, কিন্তু বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে যে সাড্‌ন্‌ ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম বা আপাত কারণবিহীন সদ্যোজাত মৃত্যুর হাত সম্ভাবনা এড়ানো যায় তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

রাত্রিকালীন স্তন্যদানের ক্ষেত্রে কী করবেন আর কী করবেন না তার একটা তালিকা নীচে দেওয়া হল।

যা করবেন:

  • আরামদায়ক জায়গায় বসুন
    দুধ খাওয়ানোর জন্য আরামদায়ক কোনও জায়গা বাছুন, এবং শিশুর পাশে শুয়ে খাওয়ান, যাতে স্তন্যদানের সঙ্গে সঙ্গেই আপনি কিছুটা বিশ্রামও নিয়ে নিতে পারেন।
  • শিশুকে কাছাকাছি রাখুন
    ঘুমোবার সময় শিশুকে নিজের কাছে, বা অন্তত কাছাকাছি রাখুন। মাঝরাতে বাচ্চা খিদেয় কাঁদতে শুরু করলে ছোটাছুটিতে সময় তো নষ্ট হয়ই, অকারণ মানসিক চাপও পড়ে।
  • দুধ খাওয়ানোর উপযোগী নরম পোশাক পরুন
    সামনে বোতাম দেওয়া সুতির তৈরি নাইটি বা স্লিপিং সুট পরুন। সহজেই বোতাম খুলে শিশুকে দুধ খাইয়ে আবার বন্ধ করে নিতে পারবেন, পোশাক ছাড়ার ঝঞ্ঝাট করতে হবে না। ঢিলেঢালা, নরম পোশাক আপনার ও আপনার শিশু উভয়ের পক্ষেই আরামদায়ক হবে।
  • বাচ্চার জরুরি জিনিসপত্র হাতের কাছে রাখুন
    ঘুম থেকে উঠে যাতে হাতড়াতে না হয়, তাই বাচ্চার পরিষ্কার ডায়াপার, ওয়াইপ্‌স্‌, ন্যাপি ইত্যাদি শোবার আগেই হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন। পারলে কিছু চটপটে খাবারও রেখে দিন; মাঝরাতে দুধ খাওয়াতে উঠলে খিদে পেয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
  • হাতের কাছে তোয়ালে রাখুন
    দুধ খাওয়ানোর পরে বাচ্চার মুখ নিজের বুক পরিষ্কার করার জন্য সব সময় নরম পরিশ্রুত তোয়ালে হাতের কাছে রাখুন।
  • সময় পেলেই ঘুমিয়ে নিন
    স্তন্যদান কালে বাচ্চার আপনার ঘুমের সময়টা পুরোপুরি বাচ্চার ঘুমের প্যাটার্নের উপর নির্ভর করবে। কাজেই বাচ্চা যখন ঘুমোচ্ছে নিজেও কিছুটা করে ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। বাচ্চাদের ঘুমের সময় সারা দিন ধরেই বদলাতে থাকে, তাছাড়া সহজেই ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতাও থাকে। কাজেই রাত্রিবেলা দুধ খাওয়ানো এক দিক দিয়ে মায়ের নিজের বিশ্রামের পক্ষেও জরুরি।

যা করবেন না :

  • ঘড়ি দেখবেন না
    রাত্রে দুধ খাওয়ানোর সময় কাছাকাছি ঘড়ি রাখবেন না। ক’ঘণ্টা পর পর ঘুম থেকে উঠেই ঘড়ি দেখলে আশঙ্কা হতে পারে যে আপনার যথেষ্ট ঘুম ও বিশ্রাম হচ্ছে না। এর থেকে অহেতুক মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বরং ঘড়ি না দেখাই শ্রেয়।
  • আলো জ্বালিয়ে রাখবেন না
    আলো বন্ধ থাকলে বাচ্চার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে সুবিধা হয়; আপনার চোখেরও কিছুটা বিশ্রাম হয়।
  • জোর করে বাচ্চার মুখে বৃন্ত গুঁজে দেবেন না
    তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বাচ্চার মুখে স্তনবৃন্ত গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বরং শিশুর মুখ নিজের বুকের কাছে তুলে নিয়ে আসুন যাতে সে আরামে দুধ খেতে পারে।
  • দুধের পরিমাণ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না
    ক্রমাগত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকে দুধের জোগান কমে যেতে পারে। কাজেই দুধের পরিমাণ কম হল কিনা এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করলেই বরং প্রকৃত অর্থে দুধের পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দুশ্চিন্তা ছেড়ে দিন, দুধের জোগান স্বাভাবিক থাকবে।

সার কথা হল, হাসিখুশি থাকুন, আনন্দে থাকুন। স্বাস্থ্যকর স্তন্যদানের গোড়ার কথা হল মায়ের সুস্থ মানসিক অবস্থা। আপনার শরীর ও মনের অবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আপনার স্তন্যদানের পরিমাণ। কাজেই, অকারণ দুশ্চিন্তাকে ছুটি দিন।